এটি মোটেও অতিশয়োক্তি নয় যে বর্তমান পৃথিবীর মানুষ পারিবারিক বন্ধনের মতো একটি বিস্ময়কর মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে। একসময় সকলের অগোচরে পৃথিবীর কোনো এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মনুষ্যত্বের উপর চরম অবমাননা ঘটে যাওয়া সম্ভব হতো। এখন সেটি আর সম্ভব হয় না। পৃথিবী থেকে যুদ্ধ-বিগ্রহ এখনো পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি কিন্তু সেটি কমানো সম্ভব হয়েছে, তার প্রধান কারণ তথ্য প্রযুক্তি। এখন কোনো দেশই বিশ্ব-বিবেকের কাছে জবাবদিহি না করে একটি অন্যায় যুদ্ধ শুরু করতে পারে না, যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে না। নেটওয়ার্কিংয়ের কারণে পুরো পৃথিবী এখন একটি বড় পরিবারের মতো, এখানে সবাই সবার সাথে যুক্ত হয়ে বসবাস করে। এই নেটওয়ার্কিংকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য একসাথে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তি গড়ে তুলতে হয়েছে। এই অধ্যায়ে শিক্ষার্থীদের সামনে সেই প্রযুক্তিগুলোর উপর আলোকপাত করা হয়েছে।
এ অধ্যায় পাঠ শেষে শিক্ষার্থীরা—
কমিউনিকেশন সিস্টেমের ধারণা বর্ণনা করতে পারবে;
ডেটা কমিউনিকেশনের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারবে;
ডেটা কমিউনিকেশন প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে পারবে;
ডেটা ট্রান্সমিশন মোডের শ্রেণিবিন্যাস করতে পারবে;
ডেটা কমিউনিকেশন মাধ্যমসমূহের মধ্যে তুলনা করতে পারবে;
ডেটা কমিউনিকেশনে অপটিক্যাল ফাইবারের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে পারবে;
ওয়্যারলেস কমিউনিকেশনের বিভিন্ন মাধ্যমসমূহ চিহ্নিত করতে পারবে;
বিভিন্ন প্রজন্মের মোবাইল ফোনের ডেটা কমিউনিকেশন পদ্ধতির মধ্যে তুলনা করতে পারবে;
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ওয়্যারলেস কমিউনিকেশনের প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করতে পারবে;
নেটওয়ার্কের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারবে;
নেটওয়ার্কের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে পারবে;
বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্কের কার্যাবলি বিশ্লেষণ করতে পারবে;
নেটওয়ার্কের টপোলজি ব্যাখ্যা করতে পারবে;
ক্লাউড কম্পিউটিং-এর ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারবে;
ক্লাউড কম্পিউটিং-এর সুবিধা ব্যাখ্যা করতে পারবে।
Printed page 43
২.১ কমিউনিকেশন সিস্টেম (Communication System)
২.১.১ কমিউনিকেশন সিস্টেমের ধারণা (Concept of Communication System)
যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন একটি সহজাত প্রক্রিয়া। শুধু মানুষ নয়, পশু-পাখিরাও নিজেদের মতো করে নিজেরা যোগাযোগ করে। মানব সভ্যতার উন্মেষের আগে থেকেই নানা ধরনের প্রয়োজন মিটানোর জন্য একজন মানুষ অন্যজনের সাথে নানা পদ্ধতিতে যোগাযোগ করেছে। এজন্য প্রথমে অংগভংগি বা আকার ইংগিত, পরবর্তীকালে নিজেদের সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করেছে। সভ্যতার উন্মেষের পর এর ধারাবাহিকতায় দূরবর্তী কারো সাথে যোগাযোগের জন্য ব্যক্তির মাধ্যমে চিঠি পাঠানো এবং পরবর্তীকালে ডাকবিভাগ, ট্রাঙ্ক কল, টেলিগ্রাফ কিংবা টেলিফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। রেডিও, টিভি ইত্যাদিও এক ধরনের যোগাযোগ প্রক্রিয়া বা মাধ্যম, যার মাধ্যমে একজন উপস্থাপক বা সংবাদ পাঠক অসংখ্য দর্শক-শ্রোতার কাছে তথ্য পৌঁছে দিয়ে যোগাযোগ করতে পারছে। এধরনের ভাবের আদান প্রদান বা তথ্য বিনিময়ের জন্য যখন একজন অন্যজনের সাথে যোগাযোগ করে থাকে সেই প্রক্রিয়াটাই কমিউনিকেশন সিস্টেম বা যোগাযোগ পদ্ধতি। বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেট, বা মোবাইল ফোনের উদ্ভাবনের পর যোগাযোগ প্রক্রিয়ার পরিধি আরো ব্যাপক, সুবিশাল এবং সহজসাধ্য হয়ে উঠেছে, এখন শুধু মানুষের সাথে মানুষ নয়, যন্ত্রের সাথে যন্ত্রেরও যোগাযোগ হতে শুরু করেছে।
আমরা বলতে পারি কমিউনিকেশন (Communication) বা যোগাযোগ কতকগুলো উপাদানের সুসমন্বয়ে কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি কিংবা যন্ত্রের মধ্যে তথ্য আদান- প্রদানের একটি প্রক্রিয়া। এটি প্রেরক, প্রাপক, যোগাযোগ-মাধ্যম এবং কিছু যন্ত্রপাতির মাধ্যমে মৌখিক কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের তথ্য বা বার্তা আদান–প্রদানের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
২.১.২ ডেটা কমিউনিকেশনের ধারণা (Concept of Data Communication)
কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ হলো তথ্য আদান-প্রদানের জন্য দুটি পয়েন্টের মধ্যে সংযোগ বা লিংক স্থাপনের প্রক্রিয়া। অর্থাৎ প্রেরণকারী ও গ্রহণকারীর মধ্যে নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে ডেটা আদান-প্রদানের একটি ব্যবস্থা। 2.1 চিত্রে একটি ইলেকট্রনিক ডেটা কমিউনিকেশন পদ্ধতির গঠন দেখানো হয়েছে।
Figure: চিত্র ২.১: ডেটা কমিউনিকেশনের বিভিন্ন অংশ
লেবেল: উৎস, গন্তব্য, নয়েজ, তথ্য উৎস, ইনপুট ট্রান্সডিউসার, ট্রান্সমিটার, মিডিয়াম, রিসিভার, আউটপুট ট্রান্সডিউসার, তথ্য গন্তব্য, শব্দ, ছবি, কথা ইত্যাদি, উৎস ডেটার ইলেকট্রিক রূপ
বর্ণনা: একটি ডেটা কমিউনিকেশন ব্যবস্থার অংশগুলো বাম থেকে ডানে সাজানো। বাম দিকে লাল রঙের "উৎস" বাক্স থেকে একটি তীর "তথ্য উৎস" বাক্সে যায়, যা একটি লাল বিন্দুযুক্ত আয়তক্ষেত্রের ভেতরে "ইনপুট ট্রান্সডিউসার"-এর সাথে যুক্ত। এরপর পরপর "ট্রান্সমিটার", "মিডিয়াম" (নিচে সবুজ বাক্স, উপরে "নয়েজ" তারকাচিহ্ন) এবং "রিসিভার" আছে। ডানদিকে লাল বিন্দুযুক্ত আয়তক্ষেত্রের ভেতরে "আউটপুট ট্রান্সডিউসার" ও "তথ্য গন্তব্য" এবং উপরে "গন্তব্য" লেবেল রয়েছে। নিচে তীরচিহ্নগুলো দেখায় "শব্দ, ছবি, কথা ইত্যাদি" এবং "উৎস ডেটার ইলেকট্রিক রূপ" কোথায় প্রবাহিত হয়।
এখানে দেখা যাচ্ছে যে ডেটা কমিউনিকেশনের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে উৎস হতে শব্দ, প্রতীক, তরঙ্গ, ছবি ইত্যাদি একটি মাধ্যম হয়ে গন্তব্যে পৌঁছে। এ প্রক্রিয়ায় একটি ট্রান্সমিটার বা প্রেরক যন্ত্র এবং একটি রিসিভার বা গ্রাহক যন্ত্র প্রয়োজন হয়। উৎস বা সোর্স হতে প্রাপ্ত ডেটাকে ইনপুট ট্রান্সডিউসারের মাধ্যমে ইলেকট্রিক সংকেতে ( আলোক সংকেতও হতে পারে) রূপান্তর করে ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে মিডিয়ামে (তারযুক্ত বা তারবিহীন) পাঠায়। এরপর মিডিয়াম হতে রিসিভার ইলেকট্রিক সংকেতকে আউটপুট ট্রান্সডিউসারের মাধ্যমে পুনরায় রূপান্তর করে গন্তব্য বা ডেস্টিনেশনে পৌঁছে দেয়। এখানে প্রাপ্ত ডেটা উৎস ডেটার ন্যায় হয়ে থাকে। উল্লেখ থাকে, উৎস হতে গন্তব্যে ডেটা প্রেরণের সময় মিডিয়ামে নয়েজ (বিক্ষিপ্তভাবে অপ্রত্যাশিত ইলেকট্রিক সংকেত) যুক্ত হতে পারে, এটি টেলিকমিনেকেশন নয়েজ নামে পরিচিত যা সংশোধনের ব্যবস্থা থাকে।
Printed page 44
ডেটা কমিউনিকেশনে ব্যবহৃত উপাদানগুলোর উদাহরণ :
১. উৎস বা সোর্স (তথ্য উৎস ও ইনপুট ট্রান্সডিউসার)- মাইক্রোফোন, ক্যামেরা, কিবোর্ড ইত্যাদি।
২. ট্রান্সমিটার বা প্রেরক যন্ত্র- বেতার কেন্দ্র, টেলিভিশন কেন্দ্র, টেলিফোন, মোবাইল ফোন, মডেম, রাউটার ইত্যাদি।
৩. মিডিয়াম বা মাধ্যম- টেলিফোন/ফাইবার অপটিক ক্যাবল, রেডিও/মাইক্রোওয়েভ ইত্যাদি।
৪. রিসিভার বা গ্রাহক যন্ত্র- টেলিফোন একচেঞ্জ,মডেম, রাউটার ইত্যাদি।
৫. গন্তব্য বা ডেস্টিনেশন (আউটপুট ট্রান্সডিউসার ও তথ্য গন্তব্য)- লাউড স্পিকার, টেলিফোন, কম্পিউটার ইত্যাদি।
২.১.৩ ব্যান্ডউইথ (Bandwidth)
বর্তমান বিশ্বে আমাদের সবারই কম-বেশি ইন্টারনেট এবং তার গতি বা স্পিড সম্পর্কে একটি ধারণা আছে। এই 'ইন্টারনেট' -এর গতি বা স্পিড তার ব্যান্ডউইথের উপর নির্ভরশীল। প্রতি সেকেন্ডে যে পরিমাণ ডেটা এক স্থান হতে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয় তাকে অর্থাৎ ডেটা স্থানান্তরের হারকে ব্যান্ডউইথ বলে। ব্যান্ডউইথ সাধারণত bit per second (bps) -এ হিসাব করা হয়। তবে ইদানীং নেটওয়ার্কে অনেক বেশি ব্যান্ডউইথ পাওয়া যায় বলে বিপিএস (bps) - এর পরিবর্তে কেবিপিএস (kbps: প্রতি সেকেন্ডে এক হাজার বিট) বা এমবিপিএস (Mbps: প্রতি সেকেন্ডে এক মিলিয়ন বিট) এমনকি জিবিপিএস (Gbps: প্রতি সেকেন্ডে এক বিলিয়ন বিট) অনেক বেশি ব্যবহৃত হয়। আট বিটকে এক বাইট বলা হয় বলে এক MBps বলতে আট Mbps বোঝানো হয়।
একটি কমিউনিকেশন নেটওয়ার্কের ব্যান্ডউইথ সেখানে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি এবং মিডিয়ামের উপর নির্ভর করে। যেমন মিডিয়াম হিসেবে সাধারণ টেলিফোনের তার ব্যবহার করলে যত ব্যান্ডউইথ পাওয়া যায়, ফাইবার অপটিক ক্যাবলে তার থেকে অনেক গুণ বেশি পাওয়া যায়। আবার ফাইবার অপটিক ক্যাবলের সাথে যদি যথাযথ স্পিডের টারমিনাল ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করা না হয় তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যান্ডউইথ পাওয়া সম্ভব হয় না।
একটি কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক যেহেতু অনেকে ব্যবহার করে তাই নেটওয়ার্কের ব্যান্ডউইথ সকল ব্যবহারকারীর মাঝে ভাগ হয়ে যায়। অনেক সময় একজন ব্যবহারকারী কিংবা একটি সার্ভিস ব্যান্ডউইথের একটা বড় অংশ দখল করে অন্যদের শেয়ার কমিয়ে দেয়। একটি নেটওয়ার্কে একজন ব্যবহারকারী কতটুকু প্রকৃত ব্যান্ডউইথ পাচ্ছে সেটি মাপার নানা ধরনের পদ্ধতি রয়েছে, নেটওয়ার্কের ডিজাইনে কিংবা যন্ত্রপাতিতে কোনো সমস্যা থাকলে সেগুলো বের করা সম্ভব। সে কারণে ব্যান্ডউইথ ম্যানেজমেন্ট বর্তমান সময়ে অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
ডেটা কমিউনিকেশনে এক ডিভাইস হতে অন্য ডিভাইসে ডেটা বিটের বিন্যাসের মাধ্যমে স্থানান্তরের প্রক্রিয়াকে ডেটা ট্রান্সমিশন মেথড বলে।
বিটের বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে ডেটা ট্রান্সমিশন মেথডকে প্যারালাল ডেটা ট্রান্সমিশন এবং সিরিয়াল ডেটা ট্রান্সমিশন এই দুভাবে ভাগ করা হয়েছে। সিরিয়াল ডেটা ট্রান্সমিশনে একটি মাধ্যম দিয়ে একবারে একটি বিট পাঠানো হয়। প্যারালাল ডেটা ট্রান্সমিশনে অনেকগুলো মাধ্যম দিয়ে একবারে একসাথে অনেক বিট পাঠানো হয়।
প্যারালাল ডেটা ট্রান্সমিশন
প্যারালাল ডেটা ট্রান্সমিশনে একসাথে ডেটা ট্রান্সমিশন করার জন্য অনেক ডেটা লাইনের সাথে প্রেরক ও গ্রাহক যন্ত্র পরস্পরের সাথে সময়ন্বয় করার জন্য একটি বা দুইটি কন্ট্রোল লাইনও থাকে। বিটগুলো ঠিক একই সময়ে একই সাথে স্থানান্তরিত হয়। কম্পিউটারের ভেতরের সার্কিটে যেহেতু ডেটাগুলো প্যারালাল পদ্ধতিতে কাজ করে সেজন্য প্যারালাল ডেটা ট্রান্সমিশনই তার স্বাভাবিক বিন্যাস। একসাথে অসংখ্য লাইনে ডেটা পাঠানো হয় বলে এটি অনেক দুতগতির ট্রান্সমিশন। তবে অনেক দূরে ডেটা পাঠাতে হলে এটি বাস্তবসম্মত নয়। তাছাড়া,প্যারালাল প্রিন্টার পোর্ট ও ক্যাবল ব্যবহার করে কম্পিউটারের সাথে প্রিন্টারের সংযোগ ইত্যাদি এর উদাহরণ।
Figure: চিত্র ২.২: প্যারালাল এবং সিরিয়াল ডেটা কমিউনিকেশন
লেবেল: প্রেরক, গ্রাহক, প্যারালাল, সিরিয়াল
বর্ণনা: উপরে একটি প্রেরক বাক্স থেকে গ্রাহক বাক্সে যাওয়া অনেকগুলো সমান্তরাল তীর, যা প্যারালাল ট্রান্সমিশন দেখায়। নিচে একটি প্রেরক ও একটি গ্রাহক বাক্স, যাদের মধ্যে একটি মাত্র তীর রয়েছে, যা সিরিয়াল ট্রান্সমিশন দেখায়।
সিরিয়াল ডেটা ট্রান্সমিশন
এই ট্রান্সমিশনে যেকোনো দূরত্বে অবস্থিত প্রেরক এবং প্রাপকের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে এক বিটের পর অপর একটি বিট স্থানান্তরিত করা হয়। এটি একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি, কেননা এতে পূর্ববর্তী ডেটা বিট প্রেরণের পর অপরটি প্রেরিত হয়। একটি মাত্র তার ব্যবহার হয় বলে যন্ত্রপাতি তুলনামূলকভাবে সহজ এবং সাশ্রয়ী। পাশাপাশি অনেক তার নেই বলে নিজেদের ভেতর নয়েজের প্রভাব কম। কম্পিউটার এবং প্রায় সকল ডিভাইসে আজকাল যে ইউএসবি (USB: Universal Serial Bus) পোর্ট দেখা যায় সেটি সিরিয়াল ট্রান্সমিশনের উদাহরণ।
প্রেরক যে সময় ডেটা প্রেরণ করবে, গ্রাহক ঠিক একই সময় ডেটা গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে প্রেরক ও গ্রাহকের ক্লক একই রকম থাকতে হয়। এজন্য সিরিয়াল পদ্ধতিতে ডেটা স্থানান্তরের সময় প্রেরক এবং গ্রাহক দুটি ডিভাইসকেই ক্লক ব্যবহার করতে হয়। ক্লকের প্রতি পালসে একটি করে বিট প্রেরণ এবং গ্রহণ করা হয়। ক্লক পালস্ বলতে একটি ক্লক সংকেতের সক্রিয় অবস্থাকে বুঝানো হয়েছে। এই ক্লক ব্যবহার করে বিটের শুরু ও শেষ বোঝার জন্য একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, যাকে বিট সিনক্রোনাইজেশন বলে। বিট সিনক্রোনাইজেশনের কারণেই প্রাপক সিগন্যাল থেকে ডেটা শনাক্ত এবং পুনরুদ্ধার করতে পারে।
Printed page 46
বিট সিনক্রোনাইজেশনের উপর ভিত্তি করে সিরিয়াল ডেটা ট্রান্সমিশন পদ্ধতিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয় :
Figure: চিত্র ২.৩: তিন ধরনের সিরিয়াল ডেটা কমিউনিকেশন
লেবেল: ট্রান্সমিশন মেথড, প্যারালাল, সিরিয়াল, অ্যাসিনক্রোনাস, সিনক্রোনাস, আইসোক্রোনাস
বর্ণনা: ট্রান্সমিশন মেথড থেকে দুটি শাখা—প্যারালাল ও সিরিয়াল। সিরিয়ালের নিচে তিনটি ধরন: অ্যাসিনক্রোনাস, সিনক্রোনাস ও আইসোক্রোনাস।
অ্যাসিনক্রোনাস ট্রান্সমিশনে ডেটা ক্যারেক্টার (বর্ণ, সংখ্যা বা চিহ্ন) ফরম্যাটে হয়ে থাকে। প্রতিবারে একটি করে ক্যারেক্টার ট্রান্সমিট করে। প্রতিটি ক্যারেক্টার আট বিটের হয়ে থাকে। অ্যাসিনক্রোনাস ট্রান্সমিশনে প্রেরক যখন খুশি তখন ডেটা প্রেরণ করতে পারে, গ্রাহক সবসময়েই সেই ডেটা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। শুধু তাই নয় একবার ডেটা পাঠিয়ে তার পরবর্তী সময় আরেকবার ডেটা পাঠানোর মাঝখানে যতক্ষণ ইচ্ছা ততক্ষণ সময় নেয়া যায়। ডেটা পাঠানোর আগে একটি স্টার্ট বিট পাঠানো হয় এবং সেই বিটটি দেখে গ্রাহকযন্ত্র বুঝতে পারে ডেটা আসতে শুরু করেছে এবং তার ক্লক সেই বিটের শুরুর সাথে সমন্বয় করে নেয়। ডেটা পাঠানো শেষ হওয়ার পর একটি বা দুইটি স্টপ বিট পাঠানো হয় এবং সেটি দেখে গ্রাহক যন্ত্র বুঝতে পারে ডেটা পাঠানো শেষ হয়েছে। এক্ষেত্রে ডেটার প্রতি ক্যারেক্টারের মাঝে বিরতির সময় সমান নাও হতে পারে। যখন প্রয়োজন তখন ডেটা প্রেরণ করা যায় বলে সেই ক্ষেত্রে প্রাইমারি স্টোরেজ ডিভাইসের (কম্পিউটারে ব্যবহৃত RAM, Cache, or CPU memory ইত্যাদি) প্রয়োজন হয় না। ধীর গতিতে অল্প পরিমাণ ডেটা পাঠানোর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির ব্যবহার সুবিধাজনক।
অ্যাসিনক্রোনাস ট্রান্সমিশনের একটি উদাহরণ হচ্ছে কম্পিউটারের কি-বোর্ড। এখানে একটি কি (Key) চাপার পর পরবর্তী কি চেপে টাইপ করার মধ্যবর্তী সময়সীমা অসম বা অনির্ধারিত হতে বাধ্য। এজন্যই এই ট্রান্সমিশন পদ্ধতির নাম অ্যাসিনক্রোনাস রাখা হয়েছে।
Figure
লেবেল: ডেটা প্রবাহ (Direction of Data Flow), স্টপ বিট (Stop Bits), স্টার্ট বিট (Start Bits), বিরতি কাল (delay time), প্রেরক SENDER, প্রাপক RECEIVER, 0110, 0, 1, 11111011, 0, 1, 110110
বর্ণনা: প্রেরক থেকে প্রাপকের দিকে ডেটা প্রবাহের তীর। একটি ক্যারেক্টারের আগে স্টার্ট বিট (এক) এবং পরে স্টপ বিট (শূন্য) দেখানো হয়েছে; দুটি ক্যারেক্টারের মাঝখানে বিরতি কাল চিহ্নিত।
সিনক্রোনাস ট্রান্সমিশন (Synchronous Transmission)
সিনক্রোনাস ডেটা ট্রান্সমিশনকে বলা যায় বিরতিহীন ডেটা ট্রান্সমিশন। এই পদ্ধতিতে বিরতিহীনভাবে প্রেরক যন্ত্র থেকে গ্রাহক যন্ত্রে ডেটা পাঠানো হয়। যেহেতু প্রেরিত ডেটা ব্যবহার করে গ্রাহক যন্ত্র তার ক্লককে সমন্বিত
Printed page 47
করে তাই প্রেরণ করার জন্য কোনো ডেটা না থাকলেও আইডল সিকোয়েন্স (idle sequence) হিসেবে পূর্ব নির্ধারিত ডেটা পাঠানো হয়।
সিনক্রোনাস ডেটা ট্রান্সমিশন পদ্ধতিতে প্রেরক-স্টেশনে প্রথমেই ডেটাকে প্রাইমারি স্টোরেজে (কম্পিউটারে ব্যবহৃত RAM, Cache, or CPU memory ইত্যাদি) সংরক্ষণ করে ডেটার ক্যারেক্টারগুলোকে ব্লক বা ফ্রেম আকারে ভাগ করে নেয়। প্রতিবার একটি করে ব্লক বা ফ্রেম ক্লকের সাথে সমন্বয় করে সমান বিরতি দিয়ে প্রেরণ করা হয়। প্রতিটি ব্লক-ডেটার শুরুতে ১ বা ২ বাইটের একটি হেডার ইনফরমেশন এবং ব্লক-ডেটার শেষে একই পরিমাপের একটি ট্রেইলার ইনফরমেশন সিগন্যাল পাঠানো হয় এবং বিশাল নেটওয়ার্কে গন্তব্য খুঁজে বের করার জন্য এর মাঝে সাধারণত প্রেরক ও গ্রাহককে চিহ্নিতকরণের সংখ্যা বা অ্যাড্রেস দেয়া থাকে। গ্রাহক যন্ত্র এই হেডার সিগন্যাল ব্যবহার করে প্রেরকের ক্লক-স্পিডের সাথে সিনক্রোনাইজ বা সমন্বিত করে। ট্রেইলার ব্লকের শেষ নির্দেশ করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্লকের ভেতরকার ভুল নির্ণয় এবং সংশোধনে সহায়তা করে।
প্রযুক্তিগতভাবে এ পদ্ধতি অপেক্ষাকৃত জটিল এবং ব্যয়বহুল হলেও বেশি ব্যান্ডউইথের ডেটা দূরবর্তী স্থানে পাঠানোর জন্য এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তাই বড় ধরনের নেটওয়ার্কসহ মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক, টিভি নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ক্ষেত্রে এটি অপরিহার্য।
Figure
লেবেল: প্রেরক Sender, প্রাপক Receiver, ডেটা প্রবাহের দিক (Direction of flow), 10100011, 11111011, 11110110, 11110111, 00010000, 110
বর্ণনা: প্রেরক থেকে প্রাপক পর্যন্ত একটি সারিতে ব্লক আকারের বাইনারি ডেটা সাজানো; ডেটা প্রবাহের তীর প্রেরক থেকে প্রাপকের দিকে।
অ্যাসিনক্রোনাস ও সিনক্রোনাস -এর একটি মিশ্র পদ্ধতি হচ্ছে আইসোক্রোনাস ট্রান্সমিশন। এ প্রক্রিয়ায় অ্যাসিনক্রোনাস পদ্ধতির স্টার্ট ও স্টপ বিটের মাঝখানে সিনক্রোনাস পদ্ধতিতে ব্লক আকারে ডেটা ট্রান্সফার করা হয়। যেহেতু পুরোটা সিনক্রোনাস নয়, তাই স্টোরেজ ডিভাইসে ডেটা সংরক্ষণ না করেই যখন প্রয়োজন তখন সেই ডেটা ট্রান্সমিট করা যায়। সাধারণত রিয়েল টাইম অ্যাপ্লিকেশনে এর প্রচলন বেশি। বিভিন্ন মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন যেমন, অডিও বা ভিডিও কলের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে ডেটা ট্রান্সমিশন হয়ে থাকে।