Skip to content

Bangla Sahapath chapter 2: Sirajuddaula

সিরাজউদ্দৌলা

  • Bangla Sahapath
  • Textbook pages 87-148
  • 1 source
  • 162,121 characters of context

Textbook (verbatim transcription): Sirajuddaula

Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.

Contents23

Printed page 87

নাটক

সিরাজউদ্দৌলা

সিকান্দার আবু জাফর

একাদশ-দ্বাদশ ও আলিম শ্রেণির উপযোগী সংস্করণ

Printed page 88

নাট্যকার-পরিচিতি

সিকান্দার আবু জাফর ১৯১৯ সালে সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মূলত একজন কবি হলেও সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ পদচারণা। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি বরাবরই অগ্রবর্তী ছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় দীর্ঘকাল ধরে প্রকাশিত মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘সমকাল’ হয়ে উঠেছিল তরুণ সাহিত্যিকদের মিলনক্ষেত্র; পাকিস্তানি অপশাসনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের এক বলিষ্ঠ প্ল্যাটফর্ম। পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিবাদ ব্যক্ত করায় এই পত্রিকা একাধিকবার নিষিদ্ধ ও এর প্রকাশিত সংখ্যা বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।

সিকান্দার আবু জাফরের শিক্ষাজীবন শুরু হয় তৎকালীন খুলনার (বর্তমানে সাতক্ষীরা) তালা বিডি ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানকার পাঠ সমাপ্ত করে তিনি কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজে (পূর্বনাম রিপন কলেজ) অধ্যয়ন করেন। শিক্ষাজীবন সমাপ্ত হবার পর ১৯৪১ সাল থেকে বিভিন্ন ধরনের মননশীল পেশায় তিনি যুক্ত হন। দেশভাগের পর তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন এবং ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন মুখ্যত একজন সাংবাদিক। কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘নবযুগ’ পত্রিকায় কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতা থেকে ‘সাপ্তাহিক অভিযান’ পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশের গুরুদায়িত্ব পালন করেন তিনি।

‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই’, ‘বাংলা ছাড়ো’ প্রভৃতি বিখ্যাত রচনার স্রষ্টা সিকান্দার আবু জাফর নাট্যকার হিসেবেও বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন। ‘সিরাজউদ্দৌলা’ ছাড়াও তাঁর আরও যেসব বিখ্যাত নাটক রয়েছে তাদের মধ্যে ‘মাকড়সা’ (১৯৬০), ‘শকুন্ত উপাখ্যান’ (১৯৫৮) এবং ‘মহাকবি আলাওল’ (১৯৬৫) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নাট্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৬ সালে তাঁকে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। কবিতা ও নাটকের পাশাপাশি উপন্যাস, অনুবাদসহ বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডেও তিনি বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।

১৯৭৫ সালের ৫ই আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

নাটকের সংজ্ঞার্থ, বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য

সাহিত্যের একটি বিশেষ রূপশ্রেণি (genre) হলো নাটক। প্রাচ্য নাট্যশাস্ত্রে একে দৃশ্যকাব্য বলে অভিহিত করা হয়েছে। গ্রিক ভাষা থেকে আগত ‘ড্রামা’ শব্দটির অর্থ হলো ‘অ্যাকশন’ তথা কিছু করে দেখানো। বাংলা ‘নাটক’, ‘নাট্য’, ‘নট’, ‘নটী’ প্রভৃতি শব্দও উদ্ভূত হয়েছে ‘নট্’ ধাতু থেকে— যার অর্থ ‘নড়াচড়া করা’। অর্থাৎ নাটকের মধ্যে এক ধরনের গতিশীলতা রয়েছে যা একটি ত্রিমাত্রিক শিল্পকাঠামো গড়ে তোলে। বলে রাখা প্রয়োজন যে, বর্তমান সময়ে নাটক পরিবেশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম টেলিভিশন হলেও মঞ্চই নাটকের প্রকৃত ও যথার্থ পরিবেশনা-স্থল। তাই নাটক বিষয়ক এই আলোচনায় মঞ্চনির্ভর নাট্য-বৈশিষ্ট্যই কেবল বিবেচনা করা হবে। প্রকৃতপক্ষে নাটকের মধ্যে একটি সামষ্টিক শিল্প-প্রয়াস সম্পৃক্ত থাকে। এতে কুশীলবগণ দর্শকদের উপস্থিতিতে মঞ্চে আবির্ভূত হয়ে গতিময় মানব-জীবনের কোনো এক বা একাধিক বিশেষ ঘটনার প্রতিচ্ছবি অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। সাধারণভাবে, নাটকে যে চারটি বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয় তা হলো : কাহিনি বা প্লট (plot), চরিত্র, সংলাপ ও পরিপ্রেক্ষিত। একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটকে ঘিরে শিল্প-ঘন কাহিনি কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং সহায়ক বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপকে আশ্রয় করে উপস্থাপিত হবার প্রয়াস পায় নাটকে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে নৃত্য-গীত, আবহসংগীত, শব্দসংযোজন, আলোকসম্পাত, মঞ্চ-কৌশল প্রভৃতি। তবে, এটি নাটক সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা মাত্র। দু-হাজার বছরেরও বেশি বয়সী এই শিল্প মাধ্যমে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। অ্যারিস্টটল কিংবা শেকসপিয়রের কালে সময়ের ঐক্য, স্থানের ঐক্য ও ঘটনার ঐক্য নিশ্চিত করা ছিল নাটক রচনার পূর্বশর্ত। কীভাবে কাহিনিমুখ (exposition), কাহিনির ক্রমব্যাপ্তি (rising action), চূড়াস্পর্শী নাট্যদ্বন্দ্ব (climax), গ্রন্থিমোচন (falling action) এবং যবনিকাপাত (conclusion)-এর মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে নাটক শুরু থেকে সমাপ্তির পথে এগিয়ে যাবে— তা-ও ছিল বিশেষভাবে কাঠামোবদ্ধ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবন পাল্টেছে। নাটক যেহেতু জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিচ্ছবি সেহেতু এই রূপশ্রেণির মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখেও এতে নানাবিধ পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক কালে অনেক নাটকেই কোনো বৃত্ত থাকে না, কেবল একটি চরিত্র নিয়েও রচিত হয়েছে অসংখ্য সফল নাটক; এমনকি সংলাপ ছাড়াও নাট্য-নির্মাণ অসম্ভব নয়। তবে উল্লিখিত কাঠামোবদ্ধ বৈশিষ্ট্যগুলো একজন নাট্যকারের পক্ষে যথার্থভাবে আয়ত্ত করা সম্ভব হলেই কেবল নাটকের সংগঠনে বিচিত্র মাত্রা যোজনা করা সম্ভব।

Printed page 89

নাটকের সঙ্গে অন্যান্য সাহিত্যমাধ্যমের পার্থক্য কী— তা নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই আলোচনা হয়ে আসছে। মহাকাব্য ও নাটকের পার্থক্য নিয়ে গ্রিক সাহিত্যতাত্ত্বিকগণ আলোচনা করে গেছেন। নাটকের সঙ্গে যে সাহিত্য-মাধ্যমের সম্পর্ক সবচেয়ে নিবিড় সেই উপন্যাস থেকে নাটক কীভাবে স্বতন্ত্র— সেই বিষয়েও নানা মনীষী আলোকপাত করেছেন। তবে, উপন্যাস ও নাটকের পার্থক্য এক সময় যত প্রকটই থাকুক, উপন্যাস-রীতির পরিবর্তন সাধনে যে অসামান্যতা এসেছে তাতে বর্তমানে নাটক ও উপন্যাস একে অপরকে নানাভাবে পরিপূরণ করছে। প্রসঙ্গত নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষণীয়:

১. কাহিনি, চরিত্র, সংলাপ এবং গতি নাটক ও উপন্যাসের সাধারণ বৈশিষ্ট্য;
২. মানব মনস্তত্ত্ব, প্রেম, মহত্ত্ব, দ্বেষ, ঈর্ষা, লোভ ও অন্যান্য মৌলিক প্রবৃত্তিসমূহের দ্বন্দ্বজটিল উপস্থাপন উভয় শিল্পের প্রতিপাদ্য বিষয়;
৩. এই দুই শিল্পমাধ্যমেই মিলনান্ত কিংবা বিয়োগান্ত কিংবা উভয়ের সমন্বিত পরিণাম দেখতে পাওয়া যায়;
৪. উভয় রূপশ্রেণি কেবল পাঠের (অধ্যয়ন করে) মধ্য দিয়ে উদ্দেশ্যের চরিতার্থতা দান করতে পারে;

এ সকল বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও বলা যায় যে, নাটক একটি বিশেষ শিল্পরীতি যা উপস্থাপনা, ক্রিয়া ও সংলাপের ভিত্তিতে উপন্যাস থেকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে পৃথক। বলা যেতে পারে নাটক সাহিত্য হয়েও এর চেয়ে আরও বেশিকিছু। এর সঙ্গে দর্শকের রুচি-চাহিদা, রঙ্গমঞ্চের ব্যবস্থাপনা ও অভিনয়-কৌশল অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পৃক্ত। প্রথাগতভাবে, নাটকে ঘটনা সন্নিবেশকল্পে একটি বিশেষ রীতি অনুসরণ করা হয়। নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ঘটনার বিকাশ থেকে পরিণতি ধাপে ধাপে সংঘটিত হতে থাকে। বলা প্রয়োজন যে, নাটকের শুরুতেই একটি দ্বন্দ্বের আভাস দেওয়া থাকে, যা মূলত নাটকটিকে পরিণতিমুখী করে তুলবার বীজশক্তিকে ধারণ করে। নাটক যত এগিয়ে যায় সেই দ্বন্দ্বও ক্রমে ক্রমে ঘনীভূত রূপ লাভ করে একটি উত্তুঙ্গ অবস্থানে পৌঁছায়। আসলে নাটকের এই দ্বন্দ্ব নিজ গতিপথের দিক থেকে বিপরীতমুখী প্রবণতায় প্রতিভাত সত্যগুলিকেই রূপ দিতে সাহায্য করে। তাই বলা যায় যে, দ্বন্দ্ব সৃষ্টি এবং তার শিল্পসফল পরিসমাপ্তি নাটকের বিশেষ লক্ষণ।

নাটকের শ্রেণিবিভাগের বিষয়টি বিবেচনা করলে একে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভাজন সম্ভব। তবে, মুখ্যত নাটককে ট্র্যাজেডি, কমেডি, মেলোড্রামা, ট্র্যাজিকমেডি এবং প্রহসন— এই পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। এদের মধ্যে ট্র্যাজেডিকেই সর্বোচ্চ আসন প্রদান করা হয়েছে; এমনকি কখনও কখনও নাটক বলতে ট্র্যাজেডিকেই বোঝানো হয়েছে। প্রথমেই ট্র্যাজেডি বিষয়ে সাধারণ ধারণা অর্জন করা প্রয়োজন।

ট্র্যাজেডি: দেবদেবীর উদ্দেশে ছাগল-ভেড়া প্রভৃতি বলি দেওয়া উপলক্ষে অনুষ্ঠিত অভিনয় থেকে ‘ট্র্যাজেডি’র জন্ম হয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে ট্র্যাজেডি নাটকের মূলে রয়েছে ব্যক্তি-আত্মার দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ তীব্র যন্ত্রণা আর হাহাকার। ট্র্যাজেডির সংজ্ঞার্থ প্রদান করতে গিয়ে অ্যারিস্টটল যা বলেছেন, তা আজও সাহিত্য সমালোচনায় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। এস. এইচ. বুচার অনূদিত অ্যারিস্টটল তাঁর ‘পোয়েটিক্স’ (৩৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) গ্রন্থে বলছেন:

Tragedy, then, is an imitation of an action that is serious, complete, and of a certain magnitude; in language embellished with each kind of artistic ornament, the several kinds being found in separate parts of the play; in the form of action, not of narrative; through pity and fear effecting the proper purgation of these emotions.

নায়ক কিংবা নায়িকামুখ্য করুণ রস পরিবেশন ট্র্যাজেডির ধর্ম। এখানে রসই প্রধান। ট্র্যাজেডির ধর্ম হলো কোনো জটিল ও গুরুতর ঘটনার আশ্রয়ে বিশেষ ধরনের রসসঞ্চার যা আমাদের অনুভূতিকে অভূতপূর্ব আবহে আলোড়িত করবে। এটি জৈব-ঐক্যবিশিষ্ট হবে অর্থাৎ, এর একটি একক অটুট আকার থাকবে। সেইসঙ্গে, এর ভাষা হবে সাংগীতিক গুণসম্পন্ন। দ্বন্দ্বপূর্ণ কাহিনির এতে বিশেষ ভূমিকা থাকলেও গঠনগত দিক থেকে এতে নাট্যিক বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য। সর্বোপরি তা একদিকে দর্শকের মনে করুণা ও ভয়ের সঞ্চার করবে; আবার অপরদিকে এক ধরনের প্রশান্তি জাগাবে। কেননা, নাটকে শত-বিপর্যয় সত্ত্বেও নায়কের যে সুদৃঢ় মহিমান্বিত অবস্থান রূপায়িত হবে তা দর্শককে বিস্ময়ঘন আনন্দ প্রদান করবে; একইসঙ্গে যে বিপর্যয় দর্শক দেখবেন তা তাঁকে এই বলে স্বস্তি দেবে যে, অন্তত দর্শকের নিজের জীবনে তা ঘটেনি। এতে দর্শকের ভাবাবেগের মোক্ষম বা বিশেষ প্রবৃত্তির পরিশোধন ঘটাবে।

Printed page 90

প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডিতে ‘নিয়তির’ বিশেষ ভূমিকা বিদ্যমান। মানুষ দৈবের কাছে কতটা অসহায়, দৈবের দুর্বিপাকে মানুষ কীভাবে চরম হতভাগ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয় এবং বেঁচে থেকে মৃত্যুময় যন্ত্রণা ভোগ করে— তা-ই নানা বৈচিত্র্যে গ্রিক ট্র্যাজেডিতে শিল্পরূপ লাভ করেছে। এই নিয়তি অতীতে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে কোনো মানুষের দ্বারা সংঘটিত কোনো অপরাধের শাস্তিস্বরূপ তাকে গ্রাস করে। এই অবস্থাকে গ্রিক ট্র্যাজেডিতে বলা হয়েছে নেমেসিস। অর্থাৎ, মানুষ কোনোভাবেই নেমেসিসকে এড়াতে পারে না— এই বিশ্বাস গ্রিক ট্র্যাজেডির মর্মবাণী। সাধারণভাবে, হত্যা, মৃত্যু, ভাগ্য বিপর্যয়, ভ্রান্তি এইসব উপাদানেই প্রাচীন ট্র্যাজেডি সার্থকতা লাভ করেছে। তবে এতে মানুষের সত্তার স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা অস্বীকৃত। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে ইংরেজ নাট্যকার শেকসপিয়র ট্র্যাজেডির এক ভিন্ন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজ পর্যন্ত এই আদর্শই বহুবিচিত্র নাট্যিক কাঠামোকে আশ্রয় করে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শেকসপিয়রের নায়ক-নায়িকা প্রায়শই নিজেদের কৃতকর্মে বিবেচনাগত ভুল বা error of judgement-এর জন্ম দেয়। আর পরিণতিতে তা-ই তাদেরকে চরম মৃত্যুযন্ত্রণায় নিপতিত করে। অর্থাৎ দৈব নয়, মানুষের দুর্ভাগ্যময় পরিণতির কারণ মানুষ নিজেই— এই চিরায়ত সত্য দর্শক শেকসপিয়রীয় ট্র্যাজেডির মাধ্যমে বারবার উপলব্ধি করে। তবে যে ধরনের ট্র্যাজেডিই হোক না কেন, নায়ক কিংবা নায়িকার দুর্ভোগ বা sufferings সমভাবে পরিলক্ষিত হয়। আর এর মধ্য দিয়েই ট্র্যাজেডি ভয়াবহতা-মিশ্রিত করুণরস সৃষ্টি করে। সফোক্লিস রচিত ‘আন্তেগোনে’, ‘অদিপাউস’, ইসকাইলাসের ‘আগামেমনন’, শেকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’, ‘ম্যাকবেথ’ প্রভৃতি বিশ্ববিখ্যাত ট্র্যাজেডি নাটক।

কমেডি: অন্যান্য নাট্যশ্রেণির মধ্যে কমেডির পরিসমাপ্তি আনন্দে বা মিলনে। জীবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গকে আশ্রয় করে রসসৃষ্টি এবং আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী সংলাপকুশলতার মধ্য দিয়েই এর সার্থকতা। সাধারণভাবে, জীবনের সহজ ও হাস্যরসপূর্ণ দিকটির রূপায়ণই কমেডির মূল প্রতিপাদ্য বলে বিবেচিত হয়। ট্র্যাজেডিতে যেমন নায়ক বা কোনো চরিত্রের হৃদয়-গভীরে গিয়ে তার মনোজগৎ, উপলব্ধির জগৎকে উন্মোচনের চেষ্টা করা হয় কিংবা নায়কের আত্মজিজ্ঞাসাকে দ্বান্দ্বিক মাত্রায় উপস্থাপন করা হয় সেরূপ কোনো কৌশল কমেডিতে গৃহীত হয় না। এর একেবারে যে ব্যতিক্রম ঘটে না তা নয়, তবে তা কখনোই ট্র্যাজেডির মতো একক কোনো চরিত্রকে আশ্রয় করে পরিণতিপ্রাপ্ত হয় না। নাটকের দ্বন্দ্ব, জটিলতা এসবই সকল চরিত্রের সমবায়ে সংঘটিত হয়। আর এরই মধ্য দিয়ে নাটকে বুদ্ধি ও মননশীলতার তির্যক প্রকাশ ঘটে। শেকসপিয়রের ‘টেমিং অব দ্য শ্রু’, ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’, ‘কমেডি অব এররস’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কমেডি নাটক।

মেলোড্রামা: একে অতিনাটকও বলা চলে। মেলোড্রামায় আবেগের উৎকট প্রাধান্য থাকে। এটিও বিয়োগান্ত নাট্যশ্রেণি। তবে এতে ট্র্যাজেডির মতো কোনো উত্তুঙ্গ নান্দনিকতা সঞ্চারিত হয় না। কখনও কখনও নাট্যিক দ্বন্দ্ব অস্পষ্ট রয়ে যায় কিন্তু আবেগের তীব্রতা দিয়ে এই শ্রেণির নাটক দর্শকের হৃদয়কে আন্দোলিত করতে চায়। প্রায়শই দুর্বল ট্র্যাজেডি নাটক মেলোড্রামায় পর্যবসিত হয়।

ট্র্যাজিকমেডি: এতে ট্র্যাজেডির গুরুগম্ভীর পরিবেশকে খানিকটা লঘু করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন হাস্যরস সম্পৃক্ত করা হয়। এর প্রকৃতি ও প্রবণতা সম্পর্কে খুব সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞার্থ কিংবা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তবে, ট্র্যাজিকমেডির ধারণাকে নাট্যলক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে অনেক নাট্যকার dramatic relief হিসেবে ট্র্যাজেডি নাটকে স্বল্প পরিসরে ব্যবহার করে থাকেন।

প্রহসন: মেলোড্রামা কিংবা ট্র্যাজিকমেডি থেকে প্রহসন বিভিন্ন মাপকাঠিতেই পৃথক। সমাজ বা ব্যক্তির দোষ-অসংগতি বিশেষভাবে দেখাবার উদ্দেশ্য নিয়েই এই প্রকার ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপমূলক নাটক রচিত হয়। এর বিষয় হিসেবে কোনো গভীর বা মৌলিক সমস্যাকে বেছে নেওয়া হয় না; কিংবা নিলেও তাকে সেই মাত্রার গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশন করা হয় না। ব্যষ্টি বা সমষ্টির ভ্রান্তি, অসংগতি ও দুর্বলতার চিত্রসমূহ প্রহসনের বিষয় ও মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হয়। নাটকের চরিত্রসমূহের হাস্যকর ক্রিয়া, নির্বুদ্ধিতা এবং কৌতুককর সংলাপ এই শ্রেণির রচনার মুখ্য বৈশিষ্ট্য।

Printed page 91

Loading the rest of the chapter…

Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.

Trusted resources

Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.