Skip to content

Bangla Sahityapath chapter 5: Playing with Literature

সাহিত্যে খেলা

  • Bangla Sahityapath
  • Textbook pages 34-40
  • 1 source
  • 17,406 characters of context

Textbook (verbatim transcription): Playing with Literature

Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.

Contents5

Printed page 34

সাহিত্যে খেলা

প্রমথ চৌধুরী

লেখক-পরিচিতি

প্রমথ চৌধুরী ১৮৬৮ সালে যশোরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল পাবনা জেলার হরিপুর গ্রামে। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দর্শনে অনার্স ও ইংরেজিতে এমএ পাশ করেন। ইংল্যান্ড থেকে সম্পন্ন করেন বার-এট ল। বাংলা সাহিত্যে তিনি চলিত গদ্যরীতির প্রবর্তক হিসেবে কীর্তিত হন। তাঁর সম্পাদনায় ১৯১৪ সাল থেকে প্রকাশিত 'সবুজপত্র' পত্রিকা এই গদ্যরীতির বাহন হয়েছিল। প্রমথ চৌধুরীর গদ্যরচনা মার্জিত নাগরিক রুচি, প্রখর বুদ্ধির দীপ্তি, অপূর্ব বাকচাতুর্য ও স্মিত হাস্যরসে সমৃদ্ধ। সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি ছিলেন আনন্দবাদী ধারার অনুসারী। তাঁর বহু রচনা প্রকাশিত হয়েছে 'বীরবল' ছদ্মনামে। প্রমথ চৌধুরী প্রধানত মননশীল প্রবন্ধলেখক হলেও গল্প এবং কবিতা রচনায়ও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। 'চার-ইয়ারী-কথা', 'নীললোহিত' ইত্যাদি তাঁর ছোটগল্পের বই। 'সনেট পঞ্চাশৎ' কাব্যগ্রন্থ। 'তেল-নুন-লকড়ি', 'বীরবলের হালখাতা', 'রায়তের কথা', 'নানাকথা' ইত্যাদি তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ। সাহিত্যিক প্রবন্ধ রচনার বড় লেখক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরীর বিশেষ সুখ্যাতি আছে।

প্রমথ চৌধুরী ১৯৪৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

জগৎ-বিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁ, যিনি নিতান্ত জড় প্রস্তরের দেহ থেকে অসংখ্য জীবিতপ্রায় দেবদানব কেটে বার করেছেন তিনিও শুনতে পাই, যখন তখন হাতে কাদা নিয়ে, আঙুলের টিপে মাটির পুতুল তৈয়ের করে থাকেন। এই পুতুল গড়া হচ্ছে তাঁর খেলা। শুধু রোদ্যাঁ কেন, পৃথিবীর শিল্পী মাত্রেই এই শিল্পের খেলা খেলে থাকেন। যিনি গড়তে জানেন, তিনি শিবও গড়তে পারেন, বাঁদরও গড়তে পারেন। আমাদের সঙ্গে বড় বড় শিল্পীদের তফাত এইটুকু যে, তাঁদের হাতে এক করতে আর হয় না। সম্ভবত এই কারণে কলারাজ্যের মহাপুরুষদের যা-খুশি তাই করবার যে অধিকার আছে, ইতর শিল্পীদের সে অধিকার নেই। স্বর্গ হতে দেবতারা মধ্যে মধ্যে ভূতলে অবতীর্ণ হওয়াতে কেউ আপত্তি করেন না, কিন্তু মর্তবাসীদের পক্ষে রসাতলে গমন করাটা বিশেষ নিন্দনীয়। অথচ একথা অস্বীকার করবার জো নেই যে, যখন এ জগতে দশটা দিক আছে তখন সেই সব দিকেই গতায়াত করবার প্রবৃত্তিটি মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক। মন উঁচুতেও উঠতে চায়, নিচুতেও নামতে চায়। বরং সত্য কথা বলতে গেলে সাধারণ লোকের মন স্বভাবতই যেখানে আছে তারই চারপাশে ঘুরে বেড়াতে চায়, উড়তেও চায় না ডুবতেও চায় না। কিন্তু সাধারণ লোকে সাধারণ লোককে কী ধর্ম, কী নীতি, কী কাব্য, সকল রাজ্যেই অহরহ ডানায় ভর দিয়ে থাকতেই পরামর্শ দেয়। একটু উঁচুতে না চড়লে আমরা দর্শক এবং শ্রোতৃমণ্ডলীর নয়ন মন আকর্ষণ করতে পারি নে। বেদীতে না বসলে আমাদের উপদেশ কেউ মানে না। রঙ্গমঞ্চে না চড়লে আমাদের অভিনয় কেউ দেখে না, আর কাষ্ঠমঞ্চে না দাঁড়ালে আমাদের বক্তৃতা কেউ শোনে না। সুতরাং জনসাধারণের চোখের সম্মুখে থাকবার লোভে আমরাও অগত্যা চব্বিশ ঘণ্টা টঙে চড়ে থাকতে চাই, কিন্তু পারি নে। অনেকের পক্ষে নিজেদের আয়ত্তের বহির্ভূত উচ্চস্থানে ওঠবার চেষ্টাটাই মহাপতনের কারণ হয়। এসব কথা বলবার অর্থ এই যে, কষ্টকর হলেও আমাদের পক্ষে অবশ্য মহাজনদের পথ অনুসরণ করাই কর্তব্য। কিন্তু ডাইনে-বায়ে ছোটখাট গলিঘুজিতে খেলাচ্ছলে প্রবেশ করবার যে অধিকার তাদের আছে, সে অধিকারে আমরা কেন বঞ্চিত হব। গান করতে গেলেই যে সুর তারায় চড়িয়ে রাখতে হবে, কবিতা লিখতে হলেই যে মনের শুধু গভীর ও প্রখর ভাব প্রকাশ করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম থাকা উচিত নয়। শিল্পরাজ্যে খেলা করবার প্রবৃত্তি

Printed page 35

ন্যায় অধিকারও বড়-ছোট সকলের সমান আছে। এমনকি, একথা বললেও অত্যুক্তি হয় না যে, এ পৃথিবীতে একমাত্র খেলার ময়দানে ব্রাহ্মণশূদ্রের প্রভেদ নেই। রাখাল ছেলের সঙ্গে দরিদ্রের ছেলেরও খেলায় যোগ দেবার অধিকার আছে। আমরা যদি একবার সাহস করে কেবলমাত্র খেলা করবার জন্য সাহিত্যজগতে প্রবেশ করি, তাহলে নির্বিবাদে সে জগতের রাজ-রাজড়ার দলে মিশে যাব। কোনোরূপ উচ্চ আশা নিয়ে সে ক্ষেত্রে উপস্থিত হলেই নিম্নশ্রেণিতে পড়ে যেতে হবে।

লেখকেরাও অবশ্য দশের কাছে হাততালির প্রত্যাশা রাখেন, বাহবা না পেলে মনঃক্ষুণ্ন হন। কেননা তারাই হচ্ছেন যথার্থ সামাজিক জীব, বাদবাকি সকলে কেবলমাত্র পারিবারিক। বিশ্বমানবের মনের সঙ্গে নিত্য নূতন সম্বন্ধ পাতানোই হচ্ছে কবিমনের নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম। এমনকি, কবির আপন মনের গোপন কথাটিও গীতিকবিতাতে রঙ্গভূমির স্বগতোক্তি স্বরূপেই উচ্চারিত হয়, যাতে করে সেই মর্মকথা হাজার লোকের কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু উচ্চমঞ্চে আরোহণ করে উচ্চৈঃস্বরে উচ্চবাক্য না করলে যে জনসাধারণের নয়ন-মন আকর্ষণ করা যায় না, এমন কোনো কথা নেই। সাহিত্যজগতে যাঁদের খেলা করবার প্রবৃত্তি আছে, সাহস আছে, ক্ষমতা আছে, মানুষের নয়ন-মন আকর্ষণ করবার সুযোগ বিশেষ করে তাদের কপালেই ঘটে। মানুষ যে খেলা দেখতে ভালোবাসে তার পরিচয় তো আমরা জড় সমাজেও নিত্য পাই। টাউনহলে বক্তৃতা শুনতেই বা ক'জন যায় আর গড়ের মাঠে ফুটবল খেলা দেখতেই বা ক'জন যায়। অথচ এ কথাও সত্য যে, টাউনহলের বক্তৃতার উদ্দেশ্য অতি মহৎ, আর গড়ের মাঠের খেলোয়াড়দের ছুটোছুটি, দৌড়াদৌড়ি আগাগোড়া অর্থশূন্য এবং উদ্দেশ্যবিহীন। আসল কথা এই যে, মানুষের দেহমনের সকল প্রকার ক্রিয়ার মধ্যে ক্রীড়া শ্রেষ্ঠ, কেননা তা উদ্দেশ্যহীন। মানুষে যখন খেলা করে, তখন সে এক আনন্দ ব্যতীত অপর কোনো ফলের আকাঙ্ক্ষা রাখে না। যে খেলার ভিতর আনন্দ নেই কিন্তু উপরি পাওনার আশা আছে, তার নাম খেলা নয়, জুয়াখেলা। এবং যেহেতু খেলার আনন্দ নিরর্থক অর্থাৎ অর্থগত নয়, সে কারণে তা কারও নিজস্ব হতে পারে না। এ আনন্দে সকলেরই অধিকার সমান।

সুতরাং সাহিত্যে খেলা করবার অধিকার যে আমাদের আছে, শুধু তাই নয়, স্বার্থ এবং পরার্থ এ দুয়ের যুগপৎ সাধনের জন্য মনোজগতে খেলা করাই হচ্ছে আমাদের পক্ষে সর্বপ্রধান কর্তব্য। যে লেখক সাহিত্য ক্ষেত্রে ফলের চাষ করতে ব্রতী হন, যিনি কোনোরূপ কার্য-উদ্ধারের অভিপ্রায়ে লেখনী ধারণ করেন, তিনি গীতের মর্মও বোঝেন না, গীতার ধর্মও বোঝেন না। কেননা খেলা হচ্ছে জীবজগতে একমাত্র নিষ্কাম কর্ম, অতএব মোক্ষলাভের একমাত্র উপায়। স্বয়ং ভগবান বলেছেন, যদিচ তার কোনোই অভাব নেই তবুও তিনি এই বিশ্ব সৃজন করেছেন, অর্থাৎ সৃষ্টি তাঁর লীলামাত্র। কবির সৃষ্টিও এই বিশ্ব সৃষ্টির অনুরূপ, সে সৃজনের মূলে কোনো অভাব দূর করবার অভিপ্রায় নেই-সে সৃষ্টির মূল অন্তরাত্মার স্ফূর্তি আর তার ফল আনন্দ। এক কথায় সাহিত্য সৃষ্টি জীবাত্মার লীলামাত্র এবং সে লীলা বিশ্বলীলার অন্তর্ভূত; কেননা জীবাত্মা পরমাত্মার অঙ্গ এবং অংশ। সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেওয়া, কারও মনোরঞ্জন করা নয়। এ দুয়ের ভিতর যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ আছে, সেইটি ভুলে গেলেই লেখকেরা নিজে খেলা না করে পরের জন্যে খেলনা তৈরি করতে বসেন।

সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য যে স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে, তার প্রমাণ বাংলাদেশে আজ দুর্লভ নয়। কাব্যের ঝুমঝুমি, বিজ্ঞানের চুষিকাঠি, দর্শনের বেলুন, রাজনীতির রাঙালাঠি, ইতিহাসের ন্যাকড়ার পুতুল, নীতির টিনের ভেঁপু এবং ধর্মের জয়ঢাক-এইসব জিনিসে সাহিত্যের বাজার ছেয়ে গেছে। সাহিত্যরাজ্যে খেলনা পেয়ে পাঠকের মনতুষ্টি হতে পারে, কিন্তু তা গড়ে লেখকের মনতুষ্টি হতে পারে না। কারণ পাঠক সমাজ যে খেলনা আজ আদর করে, কাল সেটিকে ভেঙে ফেলে। সে প্রাচ্যই হোক আর পাশ্চাত্যই হোক, কাশীরই হোক

Printed page 36

আর জার্মানিরই হোক দুদিন ধরে তা কারও মনোরঞ্জন করতে পারে না। আমি জানি যে, পাঠক সমাজকে আনন্দ দিতে গেলে তারা প্রায়শই বেদনা বোধ করে থাকেন। কিন্তু এতে ভয় পাবার কিছুই নেই; কেননা কাব্যজগতে যার নাম আনন্দ, তারই নাম বেদনা।

অপর পক্ষে এ যুগে পাঠক হচ্ছে জনসাধারণ, সুতরাং তাদের মনোরঞ্জন করতে হলে আমাদের অতি সস্তা খেলনা গড়তে হবে, নইলে তা বাজারে কাটবে না। এবং সস্তা করার অর্থ খেলো করা। বৈশ্য লেখকের পক্ষেই শূদ্র পাঠকের মনোরঞ্জন করা সংগত। অতএব সাহিত্যে আর যাই কর-না কেন, পাঠক সমাজের মনোরঞ্জন করবার চেষ্টা কোরো না।

তবে কি সাহিত্যের উদ্দেশ্য লোককে শিক্ষা দেওয়া? অবশ্য নয়। কেননা কবির মতিগতি শিক্ষকের মতিগতির সম্পূর্ণ বিপরীত। স্কুল না বন্ধ হলে যে খেলার সময় আসে না, এ তো সকলেরই জানা কথা। কিন্তু সাহিত্য রচনা যে আত্মার লীলা, এ কথা শিক্ষকেরা স্বীকার করতে প্রস্তুত নন। সুতরাং শিক্ষা ও সাহিত্যের ধর্মকর্ম যে এক নয়, এ সত্যটি একটু স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেওয়া আবশ্যক। প্রথমত শিক্ষা হচ্ছে সেই বস্তু যা লোকে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও গলাধঃকরণ করতে বাধ্য হয়, অপর পক্ষে কাব্যরস লোকে শুধু স্বেচ্ছায় নয়, সানন্দে পান করে; কেননা শাস্ত্রমতে সে রস অমৃত। দ্বিতীয়ত শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মনকে বিশ্বের খবর জানানো, সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো; কাব্য যে সংবাদপত্র নয়, একথা সকলেই জানেন। তৃতীয়ত অপরের মনের অভাব পূর্ণ করবার উদ্দেশ্যেই শিক্ষকের হস্তে শিক্ষা জন্মলাভ করেছে, কিন্তু কবির নিজের মনের পরিপূর্ণতা হতেই সাহিত্যের উৎপত্তি। সাহিত্যের উদ্দেশ্য যে আনন্দদান করা, শিক্ষা দান করা নয়, একটি উদাহরণের সাহায্যে তার অকাট্য প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে।

বাল্মীকি আদিতে মুনি-ঋষিদের জন্য রামায়ণ রচনা করেছিলেন, জনগণের জন্য নয়। এ কথা বলা বাহুল্য যে, বড় বড় মুনি-ঋষিদের কিঞ্চিৎ শিক্ষা দেওয়া তার উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু রামায়ণ শ্রবণ করে মহর্ষিরাও যে কতদূর আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলেন তার প্রমাণ তাঁরা কুশীলবকে তাঁদের যথাসর্বস্ব, এমনকি কৌপীন পর্যন্ত পেলা দিয়েছিলেন। রামায়ণ কাব্য হিসেবে যে অমর এবং জনসাধারণ আজও যে তার শ্রবণে-পঠনে আনন্দ উপভোগ করে তার একমাত্র কারণ, আনন্দের ধর্মই এই যে তা সংক্রামক। অপর পক্ষে লাখে একজনও যে যোগবশিষ্ঠ রামায়ণের ছায়া মাড়ান না তার কারণ, সে বস্তু লোককে শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল, আনন্দ দেবার জন্য নয়। আসল কথা এই যে, সাহিত্য কস্মিনকালেও স্কুলমাস্টারির ভার নেয়নি। এতে দুঃখ করবার কোনো কারণ নেই। দুঃখের বিষয় এই যে, স্কুলমাস্টারেরা একালে সাহিত্যের ভার নিয়েছেন।

কাব্যরস নামক অমৃতে যে আমাদের অরুচি জন্মেছে, তার জন্য দায়ী এ যুগের স্কুল এবং তার মাস্টার। কাব্য পড়বার ও বোঝবার জিনিস, কিন্তু স্কুলমাস্টারের কাজ হচ্ছে বই পড়ানো ও বোঝানো। লেখক এবং পাঠকদের মধ্যে এখন স্কুলমাস্টার দণ্ডায়মান। এই মধ্যস্থদের কৃপায় আমাদের সঙ্গে কবির মনের মিলন দূরে থাক, চার চক্ষুর মিলনও ঘটে না। স্কুলঘরে আমরা কাব্যের রূপ দেখতে পাই নে, শুধু তার গুণ শুনি। টীকা-ভাষ্যের প্রসাদে আমরা কাব্য সম্বন্ধে সকল নিগূঢ় তত্ত্ব জানি, কিন্তু সে কী বস্তু তা চিনিনে। আমাদের শিক্ষকদের প্রসাদে আমাদের এ জ্ঞান লাভ হয়েছে যে, পাথুরে কয়লা হীরার সবর্ণ না হলেও সগোত্র; অপর পক্ষে হীরক ও কাচ যমজ হলেও সহোদর নয়। এর একের জন্ম পৃথিবীর গর্ভে অপরটি মানুষের হাতে; এবং এ উভয়ের ভিতর এক দা-কুমড়ার সম্বন্ধ ব্যতীত অপর কোনো সম্বন্ধ নেই। অথচ এত জ্ঞান সত্ত্বেও আমরা সাহিত্যে কাচকে হীরা এবং হীরাকে কাচ বলে নিত্য ভুল করি, এবং হীরা ও কয়লাকে একশ্রেণিভুক্ত করতে

Printed page 37

তিলমাত্র দ্বিধা করিনে, কেননা ওরূপ করা যে সঙ্গত তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আমাদের মুখস্থ আছে। সাহিত্য শিক্ষার ভার নেয় না, কেননা মনোজগতে শিক্ষকের কাজ হচ্ছে কবির কাজের ঠিক উলটো। কারণ কবির কাজ হচ্ছে কাব্য সৃষ্টি করা, আর শিক্ষকের কাজ হচ্ছে প্রথমে তা বধ করা, তারপরে তার শবচ্ছেদ করা, এবং ঐ উপায়ে তার তত্ত্ব আবিষ্কার করা ও প্রচার করা। এই সব কারণে নির্ভয়ে বলা যেতে পারে যে, কারও মনোরঞ্জন করাও সাহিত্যের কাজ নয়। কাউকে শিক্ষা দেওয়াও নয়। সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়।

বিচারের সাহায্যে এই মাত্রই প্রমাণ করা যায়। তবে বস্তু যে কী, তার জ্ঞান অনুভূতিসাপেক্ষ তর্কসাপেক্ষ নয়। সাহিত্যে মানবাত্মা খেলা করে এবং সেই খেলার আনন্দ উপভোগ করে। এ কথার অর্থ যদি স্পষ্ট না হয় তাহলে কোনো সুদীর্ঘ ব্যাখ্যার দ্বারা তা স্পষ্টতর করা আমার অসাধ্য।

এই সব কথা শুনে আমার জনৈক শিক্ষাভক্ত বন্ধু এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, সাহিত্য খেলাচ্ছলে শিক্ষা দেয়।

শব্দার্থ ও টীকা

রোদ্যাঁ – ফ্রাঁসোয়া অগুস্ত রোদ্যাঁ (১৮৪০-১৯১৭) বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর। তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে– ‘নরকের দুয়ার’ ও ‘বার্গার্স অব ক্যালে’। অন্যান্য অবিনশ্বর কীর্তি– ‘চিন্তাবিদ’, ‘আদম’, ‘ইভ’। তিনি ভিক্টর হুগো, বালজাক, বার্নার্ড শ প্রমুখ বিখ্যাত সাহিত্যিকের প্রতিকৃতি নির্মাণ করেন।

শিব – মহাদেব, মঙ্গলকারী দেবতা।

ইতর – নীচ, অধম। এখানে নগণ্য অর্থে ব্যবহৃত।

কলারাজ্য – শিল্পকলার পরিমণ্ডল।

অবতীর্ণ – অবতার হিসেবে মানুষের মূর্তিতে নেমেছে এমন বা নেমে আসা।

মর্তবাসী – মাটির পৃথিবীর অধিবাসী।

রসাতল – পুরাণে বর্ণিত ষষ্ঠ পাতাল, অধঃপাত, ধ্বংস।

গতায়াত – যাতায়াত।

প্রবৃত্তি – অভিরুচি, ইচ্ছা, ঝোঁক, আসক্তি।

অগত্যা – অন্য উপায় না থাকায়, নিরুপায় বা বাধ্য হয়ে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও।

সুর তারায় চড়িয়ে রাখতে হবে – সুর উচ্চ সপ্তকে ধরে রাখতে হবে।

গীতিকবিতা – আত্মভাবপ্রধান কবিতা বিশেষ (Lyric)।

রঙ্গভূমি – আমোদ-প্রমোদের জায়গা। অভিনয় প্রদর্শনের স্থান।

স্বগতোক্তি – আপন মনে নিজে নিজে কথা বলা, অন্যের উদ্দেশ্যে বলা হয়নি এমন উক্তি।

স্বার্থ – নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধি।

পরার্থ – অন্যের হিত, পরোপকার।

নিষ্কাম কর্ম – ফললাভের কামনা করা হয়নি এমন কাজ।

Printed page 38

মোক্ষলাভ – ভববন্ধন থেকে মুক্তি লাভ, আত্মার মুক্তি অর্জন।
জীবাত্মা – প্রাণীর দেহে অবস্থানকারী আত্মা।
পরমাত্মা – পরম ব্রহ্ম, ঈশ্বর, সৃষ্টিকর্তা।
মনোরঞ্জন – মনের সন্তোষ সাধন।
স্বধর্মচ্যুত – নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত।
খেলো করা – গুরুত্বহীন বা অসার করা।
বৈশ্য – প্রাচীন আর্যসমাজের চতুর্বর্ণের তৃতীয় স্তর–যারা কৃষিকাজ বা ব্যবসা-বাণিজ্য করত।
শূদ্র – প্রাচীন আর্যসমাজের চতুর্বর্ণের নিম্নতম শ্রেণি বা বর্ণ।
মতিগতি – ইচ্ছা ও প্রবণতা।
গলাধঃকরণ – ভক্ষণ, পান।
বাল্মীকি – 'রামায়ণ' প্রণেতা বিখ্যাত ঋষি ও কবি। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের আদি কবি হিসেবে সম্মানিত। যৌবনে তার নাম ছিল রত্নাকর এবং পেশা ছিল দস্যুতা। জনশ্রুতি অনুসারে তিনি ব্রহ্মার উপদেশে দস্যুবৃত্তি ছেড়ে তপস্যামগ্ন হন এবং নারদের উপদেশে 'রামায়ণ' রচনা করেন।
কুশীলব – নট, অভিনেতা।
যথাসর্বস্ব – সমস্ত কিছু।
কৌপীন – ল্যাঙট।
পেলা – পাঁচালী কীর্তন ইত্যাদির আসরে গায়ক-গায়িকাকে দেওয়া শ্রোতাদের পারিতোষিক।
যোগবশিষ্ঠ রামায়ণ – রামচন্দ্রের প্রতি বশিষ্ঠ মুনির উপদেশ সংবলিত সংস্কৃত রামায়ণ। এতে যোগ ও আত্মজ্ঞান সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় উপাখ্যানসহ উপদেশ আকারে আলোচিত হয়েছে।
কস্মিনকালেও – কোনো সময়েই, কখনও।
টীকাভাষ্য – ব্যাখ্যা ও মন্তব্য।
নিগূঢ় – দুর্জ্ঞেয়, গভীর ও প্রচ্ছন্ন।
তত্ত্ব – কোনো বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান বা বিদ্যা, মতবাদ।
সবর্ণ – সম রং বিশিষ্ট। একই রঙের।
সগোত্র – একই গোত্রভুক্ত।
শবচ্ছেদ – শবদেহ কেটে পরীক্ষা করা, মড়া কাটা।
অনুভূতিসাপেক্ষ – অনুভূতির সাহায্যে উপলব্ধি করতে হয় এমন।
তর্কসাপেক্ষ – তর্কের মাধ্যমে বিচার বিবেচনা করতে হয় এমন।

Printed page 39

Loading the rest of the chapter…

Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.

Trusted resources

Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.