Bangla Sahityapath chapter 28: July Uprising Graffiti Literature Songs and Slogans
জুলাই অভ্যুত্থানের গ্রাফিতিতে সাহিত্য, গান ও স্লোগান
- Bangla Sahityapath
- Textbook pages 207-212
- 1 source
- 17,093 characters of context
Textbook (verbatim transcription): July Uprising Graffiti Literature Songs and Slogans
Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.
Contents4ShowHide
Printed page 207
জুলাই অভ্যুত্থানের গ্রাফিতিতে সাহিত্য, গান ও স্লোগান
‘দেয়ালেরও কান আছে’– প্রবাদটির মাঝে যে সাবধানী অভিব্যক্তি বিদ্যমান তা যেনো চব্বিশে এসে বদলে গেল। তৈরি হলো নির্ভয় অভিব্যক্তির নতুন প্রবাদ–‘দেয়ালও কথা বলে’। দেয়াল যেনো বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল। রং-তুলির আঁচড়ে দেয়ালের গ্রাফিতিগুলো নতুন এক বিপ্লবের বার্তাবহ হয়ে দেখা দিল। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের আগে ও পরে গ্রাফিতি হয়ে উঠল ভাব ও অভিব্যক্তি প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম।
গ্রাফিতি (Graffiti) হলো বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত ‘দেয়াল লিখন’ বা ‘চিকা মারা’-রই বিশেষ রূপ। দেয়াল লিখনে সাধারণত স্লোগান-জাতীয় কথা লেখা হয়, আর গ্রাফিতিতে থাকে কথা ও চিত্র দুটোই। দেয়ালের লেখা কিংবা চিত্র মানেই কিন্তু গ্রাফিতি নয়; কারণ গ্রাফিতি কেবল প্রতিবাদের অনুষঙ্গ। কারও অনুমোদনের ধার না ধেরে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে দেয়ালে বা প্রদর্শনযোগ্য স্থানে যা লেখা কিংবা আঁকা হয় তাই গ্রাফিতি।
চিত্র ও ভাষার অভিব্যক্তিতে সুনির্দিষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা আছে গ্রাফিতির। ভাষিক বোধগম্যতার জটিলতা ছাড়াই যেকোনো মানুষের কাছে সহজেই পৌঁছে যেতে পারে গ্রাফিতির বার্তা। যে মানুষ পড়তে জানে না, তাকেও আন্দোলিত করে দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতি। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে মুক্তিকামী শিক্ষার্থী-তরুণদের আঁকা গ্রাফিতির বার্তা ছিল সুনির্দিষ্ট–‘ফ্যাসিবাদকে যেতে হবে ।’ শেষ পর্যন্ত গ্রাফিতিতে উৎকীর্ণ দাবিরই জয় হয়েছে। ৫ই আগস্ট, ২০২৪ বাংলাদেশ থেকে ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে।
বাংলাদেশে গ্রাফিতি বিষয়টি আলোচনায় আসে ২০১৬-২০১৭ সালের দিকে। যখন রাতের বেলা সবার অলক্ষ্যে দেয়ালে দেয়ালে আঁকা হতো ‘সুবোধ’ নামক এক কল্পিত চরিত্র। বিক্ষুব্ধ-বিভ্রান্ত এক তরুণের বিমূর্ত ছবির পাশে লেখা থাকত–‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা’, ‘সুবোধ কবে হবে ভোর?’ ইত্যাদি। সুবোধের ছবি ছাড়াও দেয়াল জুড়ে ভাষাহীন প্রতীকী চিত্র আঁকা হতো; যার মধ্য দিয়ে সামাজিক অবক্ষয়, শুভচেতনার অভাব, বাকস্বাধীনতার সংকোচন প্রভৃতি বিষয় উপস্থাপন করা হতো। তবে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানকালে প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে গ্রাফিতি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
অনেক আগে থেকেই বিশ্বের প্রায় সর্বত্র গ্রাফিতি প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেজন্য নানা দেশে বিভিন্ন সময় গ্রাফিতির ওপর নিষেধাজ্ঞার খড়্গ নেমে এসেছে। ‘গ্যাং-সংস্কৃতি’ কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রাফিতিকে আইনবিরুদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করার নজিরও আছে। স্বৈরাচারী ও জুলুমবাজ শাসকদের নিকট গ্রাফিতি রীতিমত এক আতঙ্কের নাম। জেরুজালেমে বেথেলহেমের দেয়ালে ব্যাঙ্কসির 'Rage, Flower Thrower' or 'Love is in the Air' (২০০৩), দক্ষিণ সিরিয়ার দারা শহরের এক দেয়ালে ২০১১ সালে কিশোর মুয়াবিয়াহ সায়সানেহের আঁকা ‘ইজাক আলদাওর, ইয়া দাকতোর’ (এবার আপনার পালা, ডাক্তার) অথবা বিশ শতকের ষাটের দশকে চিলির সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় আঁকা ‘ব্রিগাদা রামোনা পারা’ (Brigada Ramona Parra) গ্রাফিতি বিশ্বময় তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অস্থিরতা ও উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। দেশের যেকোনো রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় দেয়ালগুলো ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে উঠেছিল। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৬৬ সালে ঢাকার দেয়াল ‘ডাউন উইথ আইয়ুব’ স্লোগানে ভরে উঠেছিল। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’ কিংবা ‘স্বাধীনতা আমাদের অধিকার’ প্রভৃতি স্লোগানে খচিত দেয়াল হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। স্বাধীনতার পর ‘অস্ত্র জমা দিয়েছি, ট্রেনিং জমা দিইনি’–স্লোগানটি কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠেই উচ্চারিত হয়নি, দেয়ালগাত্রেও লেখা হয়েছে ব্যাপকভাবে।
১৯৮৩ সাল থেকে শুরু হওয়া সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেত ‘সামরিকতন্ত্রে লাথি মারো, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনো’, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ ইত্যাদি স্লোগান। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে মিছিলের
Printed page 208
সামনের সারিতে থেকে স্লোগান দেন নূর হোসেন। এ কারণে পুলিশ নূর হোসেনকে মিছিলের অগ্রভাগেই গুলি করে হত্যা করে। নূর হোসেনের বুকে-পিঠে লেখা ওই স্লোগানটি তাৎক্ষণিকভাবে হয়ে ওঠে গণতন্ত্রকামী মানুষের শক্তিশালী উচ্চারণ। একইরকম ঘটনা ঘটে ১৯৯৬ সালে কল্পনা চাকমা নিখোঁজ হওয়ার পর। তখন ‘কল্পনা চাকমা কোথায়?’– এ দেয়াল লিখনটি মানুষের মনের কথা হয়ে উঠেছিল।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে গ্রাফিতি আঁকিয়েদের অধিকাংশই ছাত্রছাত্রী। আঁকা-আঁকির দক্ষতা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা না ভেবেই তারা রং-তুলি হাতে তুলে নিয়েছিল। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তাদের দেয়াল লিখনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। অধিকাংশ গ্রাফিতিতে সাম্য-মানবিক মর্যাদা এবং সুশাসনের সঙ্গে যুক্ত দাবি-দাওয়া ও আকাঙ্ক্ষা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা গভীরভাবে লক্ষ্যণীয়। অনেক গ্রাফিতিতে ফুটে উঠেছে জাতীয় জীবনে উপেক্ষিত সর্বজনীন প্রত্যাশা ও অঙ্গীকার। কোথাও কেবল ছবি এঁকে, কোথাও স্লোগান যুক্ত করে, কোথাও-বা শুধু লেখায় গণ-মানুষের দাবির কথা ফুটিয়ে তোলা হয়। কালজয়ী সাহিত্যের অমর পঙ্ক্তি, গানের বাণী এবং বহুকাল ধরে উচ্চারিত স্লোগান উৎকীর্ণ করা হয় দেয়ালে দেয়ালে।
আগের গ্রাফিতি ছিল মূলত স্লোগাননির্ভর। ২০২৪ সালের আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে গ্রাফিতি নতুন মাত্রা পায়; হয়ে ওঠে চিত্রময়। আওয়ামী শাসনের শেষ দিকে জনগণের বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, এমনকি ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার ন্যূনতম স্বাধীনতাটুকু পর্যন্ত খর্ব করে ফ্যাসিস্ট সরকার যখন একটি নজরদারিভিত্তিক পুলিশি রাষ্ট্র গঠনের দিকে এগোচ্ছিল, তখন গ্রাফিতি হয়ে ওঠে প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আন্দোলনে বিজয়ের পর নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা ও প্রত্যয়খচিত গ্রাফিতিতে ছেয়ে যায় দেয়াল। মূলত ২০২৪-এর ২৯শে জুলাই থেকে সারাদেশ গ্রাফিতিতে সয়লাব হতে থাকে। প্রথম দিকে গ্রাফিতি আঁকা হয় মূলত ঢাকার দেয়ালগুলোতে। পরে তা দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবাদ প্রকাশে গ্রাফিতিতে সাহিত্যের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশেও প্রতিবাদী গ্রাফিতিতে সাহিত্য প্রাসঙ্গিক। ১১ই জুলাই, ২০২৪ আন্দোলনের উত্তাল মুহূর্তে যখন সকলকে তাক লাগিয়ে ছাত্রেরা সম্মিলিতভাবে শাহবাগে পুলিশ ব্যারিকেড ভেঙে অগ্রসর হয়, তখন চারপাশে বারবার শোনা যাচ্ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসের বিখ্যাত উক্তি– ‘আসছে ফাগুন আমরা দ্বিগুণ হব।’ এই কথাটি পরে অনেক গ্রাফিতিতে লেখা হয়েছে বর্ণিল ভঙ্গিতে।
একইভাবে অভ্যুত্থানকালে বিভিন্ন দেয়ালে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় কাজী নজরুল ইসলামের অমর জাগরণী পঙ্ক্তি ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট।’ কবিতা থেকে গানে রূপান্তরিত কালজয়ী কবিতাটি আজও এদেশের মুক্তিকামী মানুষের দ্রোহ ও প্রতিবাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে উচ্চারিত হয়। এ গানে রয়েছে সামরিক মার্চ বা প্যারেডের উদ্দামতাভরা তাল ও ছন্দ। এ গানেরই সুর ধরে চব্বিশের অভ্যুত্থান-সারথিরা রাজপথে নেমেছে এবং এগিয়ে গেছে ফ্যাসিবাদের লৌহকপাট ভাঙতে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আরো অনেক গান ও কবিতা শোভা পেয়েছে চব্বিশের গ্রাফিতিতে।
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’– এটি চব্বিশের গ্রাফিতিতে ব্যবহৃত আরেক বিখ্যাত দ্রোহ-জাগানিয়া পঙ্ক্তি। ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নামের এই কবিতা উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে তরুণ সমাজের কাছে এটি ছিল মন্ত্রশক্তির মতো।
কবিতার মতো জাগরণমূলক গানও স্থান পেয়েছে চব্বিশের গ্রাফিতিতে। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’– গোবিন্দ হালদারের লেখা একটি বিখ্যাত গান। আপেল মাহমুদের সুর করা ও গাওয়া এই গান ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস ছিল। এই কবিতার লাইনগুলোও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ফিরে এসেছে গ্রাফিতিময় দেয়ালে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবী ধারার গানগুলো বিশেষভাবে ঠাঁই পেয়েছে গ্রাফিতি-রঙিন দেয়ালগুলোতে।
Printed page 209
গানের কথা ব্যবহারের ফলে গ্রাফিতিগুলো সহজেই হয়ে ওঠে বহু মনকে এক সুরে বাঁধার অভিনব মাধ্যম। দেয়ালজুড়ে গানের লিরিক ব্যবহার করে গ্রাফিতি আঁকিয়েরা প্রতিবাদ, ঐক্য ও সংহতির বার্তা জোরালোভাবে প্রকাশ করছিলেন। স্বৈরাচার হাসিনাবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে কণ্ঠশিল্পী মৌসুমীর গাওয়া ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি, করছ ছলাকলা’ গানটি ছিল শক্তি ও সাহসের অন্যতম উৎস। গানটি চব্বিশের গণ-আন্দোলনে অধিকতর প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ঠাঁই করে নেয় গ্রাফিতিতেও। ‘আমার বিচার তুমি করো, তোমার বিচার করবে কে?’– ‘শূন্য’ ব্যান্ডের ‘শোনো মহাজন’ গান থেকে নেওয়া এই লাইনটি ছিল চব্বিশের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের আরেক প্রতিবাদী দলিল। গানটি শুরুতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে লেখা না হলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় এটি নতুন অর্থ এবং তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়। নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে গানটি আন্দোলনকারীদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী আওয়াজে রূপ নেয়। গানটি অনিবার্যভাবে গ্রাফিতিতে জায়গা করে নেয়। একই সময় ‘কাকতাল’ নামের অপর এক ব্যান্ডের ‘রক্ত গরম মাথা ঠাণ্ডা’ গানটির চরণও দেয়ালে দেয়ালে শোভা পায় বিপ্লবী বার্তা হিসেবে। ব্যান্ডসংগীতের আরেক ধারা ‘র্যাপ’ জুলাই অভ্যুত্থানের বহুল আলোচিত-সমালোচিত সাংস্কৃতিক উপাদান। বাংলাদেশের সংগীতজগতে র্যাপ তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও, পুরো আন্দোলন জুড়ে এই গানের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতাও ছিল অবিশ্বাস্য। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বাংলা র্যাপের যে উত্থান ঘটেছে তার প্রমাণ মেলে গ্রাফিতিচিত্রেও। র্যাপসংগীতের জনপ্রিয় শিল্পী হান্নানকে ফ্যাসিস্ট সরকার আন্দোলনের তুঙ্গ মুহূর্তে গ্রেফতার করে। শিল্পী হান্নানের গানের ‘আওয়াজ উড়া বাংলাদেশ’, ‘রাস্তায় এত রক্ত ক্যা গো?’ এবং ‘রাস্তায় গুলি করলো কেডা?’ কথাগুলো গ্রাফিতির অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে অনিবার্যভাবে। দেয়ালচিত্রের ‘ফ্রি হান্নান’ কথাটি ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের মাঝে আরেকটি আন্দোলনের স্মারক হয়ে আছে।
আন্দোলনের শুরু থেকে নিত্য-নতুন স্লোগান শোনা গেছে ছাত্র-জনতার কণ্ঠে। এসব স্লোগান স্থান পায় গ্রাফিতিতেও। আন্দোলনের শুরুর দিকে আলোচিত একটি স্লোগান ছিল ‘কোটা না মেধা? মেধা, মেধা’। প্রথম দুই সপ্তাহ এটাই ছিল সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত স্লোগান। কণ্ঠ থেকে দেয়ালে স্থান করে নিতে দেরি হয়নি এ স্লোগানের। ১৫ই জুলাই রাতে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলন থেকে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে সম্বোধন করলে মুহূর্তের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এই বলে স্লোগান তোলে–‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার/কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।’ ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মুখে ‘আওয়ামী লীগের বিকল্প দেখান’ বয়ান খুব শোনা যেত। কিন্তু ২৫শে জুলাই শিক্ষার্থীরা সেই যুক্তির ভিত্তি ভাঙতে শুরু করে এই বলে, ‘তুমি কে? আমি কে?/বিকল্প, বিকল্প’; ‘বিকল্প কে? আমি-তুমি-আমরা।’ তারা এই স্লোগানের ভেতর দিয়ে নতুন এক সার্বভৌম শক্তি হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিতে শুরু করে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে স্লোগান আর গ্রাফিতি সরকারের সাথে আপসের সম্ভাবনা ক্ষীণ করে তোলে। তার স্মারক হিসেবে উল্লেখ করা যায়–‘আপস না সংগ্রাম?/সংগ্রাম সংগ্রাম’; ‘দালালি না রাজপথ?/রাজপথ, রাজপথ’ ইত্যাদি স্লোগানের কথা। এসব স্লোগান দ্রুত উঠে আসে গ্রাফিতিতেও।
সারাদেশের এরকম অসংখ্য গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী উচ্চারণের এক অবিস্মরণীয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল। স্বৈরাচার যখন সবার মুখ বন্ধ করে রেখেছিল, ঠিক সেই সময়ে দেশজুড়ে গ্রাফিতিতে উৎকীর্ণ কালজয়ী সাহিত্যের বিশেষ অংশ, গান ও স্লোগান ছাত্র-জনতার জমাটবদ্ধ ক্ষোভ ও প্রতিবাদী শক্তিকে শতগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। এ অভ্যুত্থানে দেড় সহস্রাধিক মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছেন। কয়েকশ মানুষ হারিয়েছেন তাদের দৃষ্টিশক্তি। চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কয়েক হাজার মানুষ। তাই তাঁদের মহান আত্মত্যাগের স্মারকে উদ্ভাসিত এ সকল গ্রাফিতির সাহিত্য, গান ও স্লোগান আমাদের ইতিহাসের উজ্জ্বল অংশ।
(সংকলিত)
Printed page 210
Loading the rest of the chapter…
Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.
Trusted resources
Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.