Bangla Sahityapath chapter 38: Rebel
বিদ্রোহী
- Bangla Sahityapath
- Textbook pages 260-265
- 1 source
- 11,030 characters of context
Textbook (verbatim transcription): Rebel
Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.
Printed page 260
বিদ্রোহী
কাজী নজরুল ইসলাম
কবি-পরিচিতি
কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৫শে মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নজরুলের পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ। মা জাহেদা খাতুন। গ্রামের মক্তব থেকে তিনি নিম্ন প্রাইমারি পাশ করেন। এরপর ক্রমে মাজারের সেবক, লেটোর দলের সদস্য ও পালাগান রচয়িতা হিসেবে কাজ করেন। ম্যাট্রিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষার আগে ১৯১৭ সালে সেনাবাহিনীর ৪৯নং বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়ে করাচি চলে যান। সেখানে তাঁর সাহিত্য-জীবনের সূচনা ঘটে।
সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় নজরুলের সরব উপস্থিতি থাকলেও কবি হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা 'মুক্তি'। এটি প্রকাশিত হয় 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'য় ১৯১৯ সালে। নজরুলের কবিতা আধিপত্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থেকেছে। তিনি কবিতাকে প্রতিরোধের হাতিয়ারে পরিণত করে কবিতা বিষয়ক প্রথাগত ধারণা বদলে দিয়েছেন। এজন্য তাঁকে 'বিদ্রোহী কবি' বলা হয়ে থাকে। সবকিছুর আমূল পরিবর্তন চান বলে তিনি বিপ্লবী কবি। তবে শুধু বিপ্লব-বিদ্রোহের নয়, তিনি প্রেমেরও কবি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'অগ্নি-বীণা' প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। তাঁর বিদ্রোহী-বিপ্লবী ভাব-প্রধান কাব্যগ্রন্থের মধ্যে 'বিষের বাঁশি', 'ভাঙার গান', 'সর্বহারা', 'প্রলয়-শিখা'র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রেমমূলক রোমান্টিক কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আছে 'দোলন চাঁপা', 'ছায়ানট', 'পূবের হাওয়া', 'চক্রবাক' ইত্যাদি। নজরুলকে সাম্যবাদের কবিও বলা হয়ে থাকে। তিনি 'সাম্যবাদী' নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। 'চিন্তনামা' ও 'মরুভাস্কর' জীবনমূলক কাব্যগ্রন্থ। ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, গীতিকার ও সম্পাদক হিসেবেও তিনি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদান রেখেছেন।
মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে কবি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট কবি ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
বল বীর–
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি' আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ'লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানি না কো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন।
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!
বল বীর–
চির- উন্নত মম শির!
Printed page 261
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি আর হাতে রণ-তূর্য!
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ!
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার,
আমি পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দণ্ড,
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব।
আমি উন্নন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের!
আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি,
আমি মরু-নির্ঝর ঝর ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরি,
মহা- সিন্ধু উতলা ঘুম্ঘুম্
ঘুম চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুম
মম বাঁশররি তানে পাশরি
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরি।
আমি রুষে উঠি যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!
Printed page 262
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে,
আমি উপাড়ি ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
মহা- বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না–
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
আমি চির-বিদ্রোহী বীর–
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!
(সংক্ষেপিত)
শব্দার্থ ও টীকা
নেহারি — দেখে। প্রত্যক্ষ করে।
শির নেহারি ... শিখর হিমাদ্রির; — আমার শির বা মস্তক প্রত্যক্ষ করে হিমালয়ের শিখর বা শীর্ষচূড়া পর্যন্ত মাথা নত করে আছে।
মহাপ্রলয় — সৃষ্টির ধ্বংসকাল। এই প্রলয়কালে সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মারও আয়ুর অবসান ঘটে।
নটরাজ — মহাদেবের আর এক নাম।
কানুন — আইন।
টর্পেডো — ডুবোজাহাজ থেকে নিক্ষেপযোগ্য এক ধরনের অস্ত্র।
ভীম — ভয়ানক। পঞ্চ-পাণ্ডবের দ্বিতীয় পাণ্ডব, ইনি গদা নিয়ে যুদ্ধে পারঙ্গম।
ধূর্জটি — শিব বা মহাদেবের অন্য নাম। জটাধারী শিবের জট ধূম্ররূপী বলে তাকে ধূর্জটি বলা হয়।
এলোকেশে — যার চুল বা কেশ এলানো। এখানে অকাল বৈশাখীর ঝড়ের সঙ্গে এলানো চুলের তুলনা করা হয়েছে।
আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাত্রীর — আমি বিশ্ব বিধাতার বিদ্রোহী পুত্র।
নিশাবসান — রাতের শেষ বা অবসান।
ইন্দ্রানী-সুত — ইন্দ্রের স্ত্রী ইন্দ্রানী বা শচী। তার পুত্রের নাম জয়ন্ত।
বেদুঈন — আরবদেশের একটি যাযাবর জাতি।
Printed page 263
চেঙ্গিস — চেঙ্গিস খান (১১৬২–১২২৭ খ্রিষ্টাব্দ)। মোঙ্গল জাতির অন্যতম যোদ্ধা ও সামরিক নেতা।
কুর্নিশ — কিছুটা পিছিয়ে সম্ভ্রমপূর্ণ সালাম বা অভিবাদন।
ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার — ঈশান কোণ থেকে শিঙা দ্বারা ধ্বনিত ওঙ্কার বা 'ওঁকার' বা 'ওঁ' ধ্বনি।
ইস্রাফিলের শিঙ্গা — পবিত্র কোরআনে উল্লিখিত বিশিষ্ট ফেরেশতার নাম ইস্রাফিল। তিনি শিঙায় ফুঁ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিয়ামত সংঘটিত হবে। কিয়ামত বা প্রলয়কালে হযরত ইস্রাফিলের ব্যবহৃত শিঙ্গা।
পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল — শিব বা মহাদেব পিণাক নামক ধনু ধারণ করেন বলে তার নাম পিণাক-পাণি। তাঁর অন্য হাতে থাকে ডমরু নামক ডুগডুগি জাতীয় বাদ্যযন্ত্র ও ত্রিশূল।
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ — বিষ্ণু বা সুদর্শন চার হাত বিশিষ্ট। তাঁর এক একটি হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম। এখানে বিষ্ণুর হাতের চক্র ও শঙ্খকে বোঝানো হয়েছে।
প্রণব-নাদ — ওঙ্কার ধ্বনি।
দুর্বাসা — ভারতীয় পুরাণের কোপন-স্বভাব বিশিষ্ট মুনি। মহর্ষি অত্রির ঔরসে ও তাঁর স্ত্রী অনসূয়ার গর্ভে দুর্বাসার জন্ম। এর কোপানলে পড়ে অনেকেই দগ্ধ হন।
বিশ্বামিত্র — বিশিষ্ট ব্রহ্মর্ষি। ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করেও কঠোর তপস্যার ফলে তিনি ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেন।
হুতাশী — হা-হুতাশ করে যে।
নিদাঘ — গ্রীষ্ম।
মরু-নির্ঝর — মরুভূমির ঝরনা।
অর্ফিয়াস — গ্রিক পুরাণের গানের দেবতা অ্যাপোলো ও মিউজ ক্যালোপির পুত্র অর্ফিয়াস ছিলেন মহান কবি ও শিল্পী। তবে মতান্তরে ইনি থ্রেসের রাজা ইগ্রাসের সন্তান। ইনি যন্ত্রসংগীতে পারদর্শী ছিলেন। যন্ত্রসংগীতে সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন। ইনি সুরের ইন্দ্রজাল বিস্তার করে ভালোবাসার পাত্রী ইউরিডিসের মন জয় করেছিলেন। সুরের জাল বিস্তার করে অর্ফিয়াস মৃত ইউরিডিসের প্রাণ ফিরে পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সামান্য ভুলের জন্য ঐ সাফল্য তাঁর অধরা থেকে যায়।
তান — সুরের বিস্তার।
পাশরি — ভুলে যাই; বিস্মৃত হওয়া।
হাবিয়া দোজখ — সাতটি দোজখের একটি। সবচেয়ে ভয়ানক দোজখ।
Printed page 264
পরশুরাম – বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার। জমদগ্নি ও রেণুকার পঞ্চম পুত্র। অস্ত্র হিসেবে পরশু বা কুঠার ধারণ করায় তাঁর নাম হয় পরশুরাম। ইনি পিতার আদেশে কুঠার দিয়ে মাতৃহত্যা করেন। আবার সাধনাবলে মাকে বাঁচিয়ে তোলেন।
পরশুরামের কঠোর ... বিশ্ব – পরশুরাম একুশ বার ক্ষত্রিয়দের নিধন করেন।
হল – লাঙ্গল। বলরামের অস্ত্র।
বলরাম – শ্রীকৃষ্ণের বৈমাত্রেয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা।
খড়্গ – অস্ত্রবিশেষ। বলিদানে ব্যবহৃত হয়।
কৃপাণ – তলোয়ার বা তরবারি সদৃশ অস্ত্রবিশেষ।
ভীম রণ-ভূমে রণিবে না – ভয়ানক রণক্ষেত্রে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে না।
পাঠ-পরিচিতি
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নি-বীণা’ (১৯২২) থেকে সংকলিত হয়েছে। অগ্নি-বীণা কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতা ‘বিদ্রোহী’।
‘বিদ্রোহী’ বাংলা সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা। রবীন্দ্রযুগে এ কবিতার মধ্য দিয়ে এক প্রাতিস্বিক কবিকণ্ঠের আত্মপ্রকাশ ঘটে– যা বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক বিরল স্মরণীয় ঘটনা।
‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আত্মজাগরণে উন্মুখ কবির সদম্ভ আত্মপ্রকাশ ঘোষিত হয়েছে। কবিতায় সগর্বে কবি নিজের বিদ্রোহী কবিসত্তার প্রকাশ ঘটিয়ে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের শাসকদের শাসন ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দেন। এ কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কবির ক্ষোভ ও বিদ্রোহ। কবি সকল অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে গিয়ে বিভিন্ন ধর্ম, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও পুরাণের উৎস থেকে উপাদান সংগ্রহ করে নিজের বিদ্রোহী সত্তার অবয়ব রচনা করেন। বিদ্রোহী কবি উচ্চকণ্ঠ ঘোষণায় জানিয়ে দেন যে, উৎপীড়িত জনতার ক্রন্দনরোল যতদিন পর্যন্ত প্রশমিত না হবে ততদিন এই বিদ্রোহী কবিসত্তা শান্ত হবে না। এই চির বিদ্রোহী অভ্রভেদী চির উন্নত শিররূপে বিরাজ করবে।
Loading the rest of the chapter…
Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.
Trusted resources
Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.