Bangla Sahityapath chapter 48: February 1969
ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯
- Bangla Sahityapath
- Textbook pages 300-303
- 1 source
- 6,993 characters of context
Textbook (verbatim transcription): February 1969
Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.
Contents6ShowHide
Printed page 300
ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯
শামসুর রাহমান
কবি-পরিচিতি
শামসুর রাহমান ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস নরসিংদীর জেলার রায়পুর উপজেলার পাড়াতলি গ্রামে। পিতার নাম মোখলেসুর রহমান চৌধুরী। মাতা আমেনা খাতুন। তিনি ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন সাংবাদিক। 'দৈনিক মর্নিং নিউজ' ও 'দৈনিক পাকিস্তান' (পরে 'দৈনিক বাংলা') পত্রিকায় বেশিরভাগ সময় চাকরি করেছেন। শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে 'সাপ্তাহিক সোনার বাংলা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
শামসুর রাহমান কবিজীবনের প্রথম দিকে জীবনানন্দ দাশ দ্বারা প্রভাবিত হলেও খুব দ্রুতই নিজস্ব কাব্য-ভাষা নির্মাণ করতে সক্ষম হন। বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে তাঁর কবিতা বরাবরই গভীর সম্পর্ক রেখে চলেছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন তাঁর কবিতায় বিশেষভাবে বাণীমূর্তি লাভ করেছে। এছাড়া নগর জীবন তাঁর কবিতায় বিশেষভাবে রূপায়িত হওয়ায় তাঁকে অনেকে 'নাগরিক কবি' বলে থাকেন। শামসুর রাহমানের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: 'প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে', 'রৌদ্র করোটিতে', 'বিধ্বস্ত নীলিমা', 'নিরালোকে দিব্যরথ', 'নিজ বাসভূমে', 'বন্দী শিবির থেকে', 'ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা', 'উড্ডট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ', 'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়' ইত্যাদি। এছাড়া গল্প-উপন্যাস, শিশুসাহিত্য ও অনুবাদ কর্মেও তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তিনি আদমজি পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে
কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা
একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়—ফুল নয়, ওরা
শহিদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।
একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রং।
এ-রঙের বিপরীত আছে অন্য রং,
যে-রং লাগে না ভালো চোখে, যে-রং সন্ত্রাস আনে
প্রাত্যহিকতায় আমাদের মনে সকাল-সন্ধ্যায়–
এখন সে রঙে ছেয়ে গেছে পথ-ঘাট, সারা দেশ
ঘাতকের অশুভ আস্তানা।
Printed page 301
আমি আর আমার মতোই বহু লোক
রাত্রি-দিন ভূলুণ্ঠিত ঘাতকের আস্তানায়, কেউ মরা, আধমরা কেউ,
কেউ বা ভীষণ জেদি, দারুণ বিপ্লবে ফেটে পড়া। চতুর্দিকে
মানবিক বাগান, কমলবন হচ্ছে তছনছ।
বুঝি তাই উনিশশো উনসত্তরেও
আবার সালাম নামে রাজপথে, শূন্যে তোলে ফ্ল্যাগ,
বরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে।
সালামের চোখ আজ আলোচিত ঢাকা,
সালামের মুখ আজ তরুণ শ্যামল পূর্ব বাংলা।
দেখলাম রাজপথে, দেখলাম আমরা সবাই জনসাধারণ
দেখলাম সালামের হাত থেকে নক্ষত্রের মতো
ঝরে অবিরত অবিনাশী বর্ণমালা
আর বরকত বলে গাঢ় উচ্চারণে
এখনো বীরের রক্তে দুঃখিনী মাতার অশ্রুজলে
ফোটে ফুল বাস্তবের বিশাল চত্বরে
হৃদয়ের হরিৎ উপত্যকায়। সেই ফুল আমাদেরই প্রাণ,
শিহরিত ক্ষণে ক্ষণে আনন্দের রৌদ্রে আর দুঃখের ছায়ায়।
[সংক্ষেপিত]
শব্দার্থ ও টীকা
আবার ফুটেছে দ্যাখো ...
আমাদের চেতনারই রং – প্রতি বছর শহরের পথে পথে কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটে। কবির মনে হয় যেন ভাষা-শহিদদের রক্তের বুদ্বুদ কৃষ্ণচূড়া ফুল হয়ে ফুটেছে। তাই একুশের কৃষ্ণচূড়াকে কবি আমাদের চেতনার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চান। ভাষার জন্য যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, জীবন উৎসর্গ করেছেন তাঁদের ত্যাগ আর মহিমা যেন মূর্ত হয়ে ওঠে থরে থরে ফুটে থাকা লাল কৃষ্ণচূড়ার স্তবকে-স্তবকে।
মানবিক বাগান – মানবীয় জগৎ। মনুষ্যত্ব, ন্যায় ও মঙ্গলের জগৎ।
কমলবন – পদ্মবন। কবি মানবিকতা, সুন্দর ও কল্যাণের জগৎ বোঝাতে 'কমলবন' প্রতীকটি ব্যবহার করেছেন।
Printed page 302
বুঝি তাই উনিশশো ...
থাবার সম্মুখে। – ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ক্রমধারায় ছাত্র-অসন্তোষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ব্যাপক আন্দোলন ১৯৬৯-এ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শহর ও গ্রামের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ছয় দফা ও ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ছিল অপ্রতিরোধ্য। এই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন আসাদুজ্জামান, মতিউর, ড. শামসুজ্জোহা প্রমুখ। এ অংশে কবি শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ও আত্মাহুতি দেওয়া বীর জনতাকে ভাষা-শহিদ সালাম ও বরকতের প্রতীকে তাৎপর্যময় করে তুলেছেন।
সেই ফুল আমাদেরই প্রাণ – 'ফুল' বলতে এখানে বাংলা ভাষা বোঝানো হয়েছে।
পাঠ-পরিচিতি
'ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯' শীর্ষক কবিতাটি কবি শামসুর রাহমানের 'নিজ বাসভূমে' কাব্যগ্রন্থ থেকে চয়ন করা হয়েছে। 'ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯' দেশপ্রেম, গণ-জাগরণ ও সংগ্রামী চেতনার কবিতা।
১৯৬৯সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে যে গণ-আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, কবিতাটি সেই গণ-জাগরণের পটভূমিতে রচিত। জাতিগত শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে এদেশের সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ১৯৬৯-এ। প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসংখ্য মানুষ জড়ো হয় ঢাকার রাজপথে। শামসুর রাহমান এই বিচিত্র শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রামী চেতনার অসাধারণ এক শিল্পভাষ্য নির্মাণ করেছেন এই কবিতায়।
কবিতাটিতে দেশমাতৃকার প্রতি জনতার বিপুল ভালোবাসা সংবর্ধিত হয়েছে। দেশকে ভালোবেসে মানুষের আত্মদান ও আত্মাহুতির প্রেরণাকে কবি গভীর মমতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে মূর্ত করে তুলেছেন। কবিতাটি একুশের রক্তঝরা দিনগুলোতে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এদেশের সংগ্রামী মানুষের আত্মাহুতির মাহাত্ম্যে প্রগাঢ়তা লাভ করেছে। গদ্যছন্দ ও প্রবহমান ভাষার সুষ্ঠু বিন্যাসে কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সংযোজন।
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১. 'ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯' কবিতায় বর্ণমালাকে কীসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
ক. নক্ষত্র
খ. রক্ত
গ. ফুল
ঘ. রৌদ্র
Printed page 303
২. "আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে"— চরণটি আমাদের জাতীয় জীবনের কোন দিকটি তুলে ধরে?
ক. গণ-আন্দোলন
খ. ভাষা আন্দোলন
গ. স্বাধীনতা আন্দোলন
ঘ. স্বদেশি আন্দোলন
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে ৩ ও ৪ সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দাও।
১৯৭১ সালে মাতৃভূমির মুক্তির জন্য অকাতরে জীবন বিসর্জন দেন মতিউর রহমান, মোস্তফা কামাল, মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরসহ লক্ষ লক্ষ মানুষ। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
৩. উদ্দীপকের ত্যাগী মানুষদের প্রতিচ্ছবি 'ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯' কবিতায় যাদের নির্দেশ করে তারা হলেন—
i. সালাম
ii. বরকত
iii. দুঃখিনী মাতা
কোনটি ঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii
৪. ওই ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের মূলমন্ত্র কী ছিল?
ক. আদর্শ
খ. দেশপ্রেম
গ. বিদ্রোহ
ঘ. স্বাধিকার
সৃজনশীল প্রশ্ন
আহা ডিসেম্বর! একটা তর্কাতীত মাস!
মুক্তিযুদ্ধের কবিতা লিখতে হবে কেননা
ডিসেম্বর একটা অর্থপূর্ণ মাস।
কেননা এই মাসে ধু-ধু আকাশের নিচে
বধ্যভূমিগুলো চিৎকার করতে থাকে
মানুষ ও শিয়ালের সম্মিলিত কণ্ঠে-
কান্নার রোল পড়ে যায় ধরণীতে।
ক. শহরের পথে কোন ফুল ফুটেছে?
খ. কবি 'ঘাতকের আস্তানা' বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন?
গ. উদ্দীপকের ভাববস্তুর সাথে 'ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯' কবিতার মূলভাবের সাদৃশ্য কীসে ব্যাখ্যা করো।
ঘ. "ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কবিতার সাথে উদ্দীপকের কবিতাংশের ভাবগত ঐক্য থাকলেও রাজনৈতিক পটভূমি ভিন্ন।"—উক্তিটির যথার্থতা বিচার করো।
Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.
Trusted resources
Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.