Skip to content

Bangla Sahityapath chapter 50: Your Own Flag

তোমার আপন পতাকা

  • Bangla Sahityapath
  • Textbook pages 308-313
  • 1 source
  • 10,712 characters of context

Textbook (verbatim transcription): Your Own Flag

Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.

Contents6

Printed page 308

তোমার আপন পতাকা

হাসান হাফিজুর রহমান

কবি-পরিচিতি

হাসান হাফিজুর রহমান বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি জামালপুরে তাঁর নানাবাড়িতে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই জুন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিল জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার কুলাকান্দি গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আবদুর রহমান এবং মায়ের নাম হাফিজা খাতুন। তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। পরে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে বিএ পাস করেন।

কর্মজীবনে শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের চাকরি— এমনি নানা পেশায় তিনি যুক্ত ছিলেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রথম সাহিত্য-সংকলন 'একুশে ফেব্রুয়ারি' তিনিই সম্পাদনা করেন। মৃত্যুর আগে তিনি ষোল খণ্ডে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিল সংকলন ও সম্পাদনা করেন। কেবল কবিতা নয়—প্রবন্ধ, গল্পসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর ছিল দৃপ্ত পদচারণা। স্বদেশ, সমকাল এবং সাধারণ মানুষ তাঁর সাহিত্যচর্চার মুখ্য প্রণোদনা। সাহিত্য ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্যে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো : 'বিমুখ প্রান্তর', 'আর্ত শব্দাবলি', 'অন্তিম শরের মতো', 'যখন উদ্যত সঙ্গীন', 'বজ্রে চেরা আঁধার আমার', 'শোকার্ত তরবারি' প্রভৃতি।

তিনি ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দের পহেলা এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।

এবার মোছাব মুখ তোমার আপন পতাকায়।
হাজার বছরের বেদনা থেকে জন্ম নিল
রক্তিম সূর্যের অধিকারী যে শ্যামকান্ত ফুল
নিঃশঙ্ক হাওয়ায় আজ ওড়ে, দুঃখভোলানিয়া গান গায়।
মোছাব তোমার মুখ আজ সেই গাঢ় পতাকায়।
ক্রূর পদাতিক যত যুগে যুগে
উদ্ধত পায়ের দাগ রেখে গেছে কোমল পলির ত্বকে,
বিভিন্ন মুখের কোটি অশ্বারোহী এসে
খুরে খুরে ক্ষতময় করে গেছে সহনীয়া মাটি,
লালসার লালামাখা ক্রোধে বন্দুক কামান কত
অসুর গর্জনে চিরেছে আকাশ পরিপাটি,
বিদীর্ণ বুক নীল বর্ণ হয়ে গেছ তুমি, বাংলাভূমি
নত হয়ে গেছে মুখ ক্ষোভে ও লজ্জায়।
এবার মোছাব সেই মুখ শোকাক্রান্ত, তোমার আপন পতাকায়।
কে আসে সঙ্গে দেখ দেখ চেয়ে আজ :
কারখানার রাজা, লাঙ্গলের নাবিক,

Printed page 309

উত্তাল ঢেউয়ের শাসক উদ্যত বৈঠা হাতে মাল্লা দল,
এবং কামার কুমোর তাঁতি। এরাতো সবাই সেই
মেহনতের প্রভু, আনুগত্যে
শানিত রক্তে ঢল হয়ে যায় বয়ে তোমার শিরাময় সারা পথে পথে।
দুহাতে সরায় দ্রুত শহরের জটিল পঙ্কিল,
মধ্যবিত্ত অনড় আবিল। একে একে সকলকে নামায় মিছিলে।
ডাকে আপামর ভাই বোন। একসাথে মিলে নিশ্ছিদ্র
বিশাল শিলাদৃঢ় পাহাড় বানায়।
সেই কোটি হাত এক হাত হয়ে
মোছাবে তোমার মুখ তোমার আপন পতাকায়।
সমস্ত শূন্যতায় আজ বিশুদ্ধ বাতাস বয়ে যায়
আকাশ চাঁদোয়া জ্বলে রাহুমুক্ত ঘন নীলিমায়।
অকলুষ বাংলাভূমি হয়ে ওঠো রাতারাতি আদিগন্ত তীর্থভূমি।
অন্তহীন মিছিলের দেশ,
সারি সারি মানুষের আকারে হলে মূর্তিময়ী
সমস্ত স্বদেশ আজ রাঙা রাজপথে।
দিবালোক হয়ে ফোটে প্রাঞ্জল বিপ্লব
সাত কোটি মুখ হাসে মৃত্যুর রঙিন তীর হাতে নিয়ে।
শ্রেণিবদ্ধ এই ভিড়ে সকলেই সবার আগে
একবার শত্রুকে শেষ দেখা দেখে নিতে চায়।
দুঃসাহস চমকায় বরাভয় হিল্লোলিত তোমার আপন পতাকায় ॥
তুমি আছো কাজল দিঘির পাড়ে, কোকিলের মধুক্ষরা স্বরে,
হরিৎস্বপ্নে ফুলে-ওঠা প্রান্তরের উর্বর আদরে
সিংহপ্রাণ গিরিবর্ত্মে এবং বঙ্গোপসাগর
নামক আকুল ঐ অস্থিরতার তুমুল গভীরে
আছো দিন-রাত্রি অগ্নিমুখ অশনির অশেষ অধীরে।
তুমি আছো আজো, ছিলে চিরকাল।
বিশ্বের সেরা সুন্দরী বলে লুটেছ প্রবাদের খ্যাতি
যদিও রত্নখচা তোমার সৌন্দর্য সেই অবিরত তোমারই হয়েছে কাল।

Printed page 310

তোমাকে মুঠোতে ভরে আনন্দের ঝুমঝুমি
বাজাতে এসেছে যারা
সুকালের ভোজসভার ক্ষুধার্ত অতিথি
রক্ত নিয়ে মুখে ধিক্কারে ধিক্কারে পলাতক তারা,
আবহমান বাংলার বর্বরতম দখলদারও দেখ আজ
কুৎসিততম আঁধারে নির্ঘাৎ হবে লীন।
তুমি ছিলে অমলিন, আজো আছ অমলিন।
শত কোটি লাঞ্ছনার তিক্ত দাগ সারা দেহে সয়ে
আজো তুমি মাতা, শুচিশুদ্ধ মাতা সাত কোটি সংশপ্তক
সন্তানের অকাতর তুমি মাতা।
প্রেম অবারিত হবে বিজয়ের ধারাজলে, রৌদ্র, জোছনায়।
শত শতাব্দীর অবগুণ্ঠিত আশা পূর্ণ করে—
মোছাব তোমায় মুখ তোমারই আপন পতাকায়॥

শব্দার্থ ও টীকা

রক্তিম সূর্যের অধিকারী যে
শ্যামকান্ত ফুল — কবি এখানে আমাদের পতাকার সবুজ শ্যামল জমিনে ঘেরা লাল অংশকে বোঝাতে চেয়েছেন।
পদাতিক — স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্য।
অসুর — ভয়ংকর বিপজ্জনক শত্রু বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
বিদীর্ণ বুক নীল বর্ণ
হয়ে গেছ তুমি — কষ্টের রঙকে নীল বলে সাধারণত অভিহিত করা হয়। এখানে স্বদেশের ওপর যুগে যুগে বহিঃশক্তির যে নির্যাতন আগ্রাসন সংঘটিত হয়েছে তার পরিণতিতে দুঃখ-ক্লিষ্ট বাংলাকে বোঝানো হয়েছে।
কারখানার রাজা — শ্রমিকরাই কারখানার প্রাণ। তাই তাদের রাজা বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
লাঙলের নাবিক — সমুদ্রপথে নাবিক যেমন জলের বুক কেটে নতুন পথ আবিষ্কারে ব্রতী হয় তেমনি বাংলার কৃষকও লাঙলের ফলা দিয়ে মাটি চিরে সমৃদ্ধ ফসলভরা আগামী দিনের পথ তৈরিতে সচেষ্ট হয়।
এরা তো সবাই সেই
মেহনতের প্রভু — দেশের শ্রমজীবী মানুষকে বোঝানো হয়েছে। আমাদের সমাজে মেহনতি

Printed page 311

মানুষ তাদের প্রাপ্য সম্মান পায় না। অনেক সময় তাদেরকে অন্যের দাসত্ব করতে হয়। কিন্তু কবি এখানে খেটে খাওয়া মানুষের শ্রমের ওপর তাদেরই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করেছেন।
আনুগত্যে শানিত রক্তে
ঢল হয়ে যায় বয়ে তোমার
শিরাময় সারা পথে পথে — নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীর জলকে শ্রমিকের শ্রমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
দুহাতে সরায় দ্রুত শহরের
জটিল পঙ্কিল — মেহনতি মানুষের কথা বলতে গিয়ে কবি এখানে শহরের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কথা স্মরণ করেছেন।
মধ্যবিত্ত অনড় আবিল।
একে একে সকলকে
নামায় মিছিলে — এদেশের শ্রমজীবী মানুষের যে লড়াকু মানসিকতা রয়েছে তার বিপরীতে কবি প্রত্যক্ষ করেছেন মধ্যবিত্তের স্থবিরতা, আপসকামিতা। কিন্তু এই দুর্বলতাকে পরাভূত করেছে তাদের প্রতি শ্রমজীবী মানুষের উদাত্ত আহ্বান। তাই সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ মিছিলে এক হয়ে গেছে, স্বদেশের মুক্তি সকলের কাছে অভিন্ন লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
আপামর — পামর তথা নিচ পাপিষ্ঠ ব্যক্তিসহ সকলে। অর্থাৎ কাউকেই বাদ না দিয়ে। উচ্চ নিচ নির্বিশেষে।
চাঁদোয়া — কাপড়ের তৈরি চিত্রবিচিত্র ছাউনি, সামিয়ানা।
রাহু — ক্ষতিকারক ব্যক্তি বা শত্রু অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
দিবালোক হয়ে ফোটে
প্রাঞ্জল বিপ্লব — এটি একটি চিত্রকল্প। সূর্যের আলো ফুটে দিনের শুরু হয়। কবি সেই আলো ফোটার সঙ্গে বিপ্লবের প্রাণময়তাকে তুলনা করেছেন।
হরিৎ — সবুজ
গিরিবর্ত্ম — পাহাড়ি পথ।
সংশপ্তক — যে যোদ্ধা এই মর্মে শপথ নেয় যে, হয় যুদ্ধে জয়ী হবে অথবা মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। মহাভারতে কৃষ্ণের নারায়ণী সেনাদলে সংশপ্তক যোদ্ধা ছিল, যারা মরণপণ করে যুদ্ধ করত।

পাঠ-পরিচিতি

'তোমার আপন পতাকা' কবিতাটি হাসান হাফিজুর রহমানের 'যখন উদ্যত সঙ্গীন' শীর্ষক কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলন করা হয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে হাজার বছরের যন্ত্রণা ঘুচিয়ে বাংলাদেশের উজ্জ্বল অভ্যুদয়কে কবি দ্যোতিত করেছেন এই কবিতায়। স্বাধীন দেশের একান্ত আপন যে স্বাধীন পতাকা, তা দিয়েই হাজার বছর ধরে পরিশ্রান্ত বঙ্গজননীর সকল ক্লান্তি মুছিয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে তাঁর কণ্ঠে।

Printed page 312

ইতিহাস-সচেতন কবি অনুভব করেন কীভাবে দীর্ঘকাল ধরে বাংলা অঞ্চল বারংবার আক্রান্ত হয়েছে। শত্রুসেনার অস্ত্রের ঝনঝনানি আর তাদের দম্ভপূর্ণ পদভারে বেদনা-নীল হয়েছে এদেশের মাটি, প্রকৃতি এবং প্রাকৃত জীবন। কিন্তু এ-ও সত্য যে, শত্রুর হুংকার কখনোই এদেশে চিরস্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি। কেননা, এদেশের শ্রমিক, কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার, মাঝি—প্রমুখ সাধারণ মানুষ তাদের বুকের রক্ত ঢেলে সজীব করে রেখেছে এই মাটির প্রাণস্পন্দনকে। তারা যুগে যুগে মিছিলের মতো সমবেত হয়েছে, দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে তুলেছে, কোটি হাত এক হয়ে গিয়ে সেই হাতে বাংলা মায়ের মুখের সবটুকু শান্তি মুছে দিতে চেয়েছে। একই পতাকাতলে মিলিত হওয়ার প্রেরণায় উনিশশো একাত্তরে উজ্জীবিত হয়েছিল এ দেশের মানুষ। অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল তার উত্তাপ। সে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে কবির অনুভবে। কবিচৈতন্যে ভিড় করে মিছিল, লড়াই, রক্তে রাঙা রাজপথ আর শত্রুকে রুখে দেওয়ার দুরন্ত সাহসে ভরা দৃপ্ত মানুষের মুখ। সেই সংগ্রামকে তিনি প্রতিবিম্বিত হতে দেখেন লাল-সবুজের পতাকায়।

সংগ্রামী অনুভবের পাশাপাশি কবির অনুভবে ধরা পড়ে আবহমান বাংলার অনিন্দ্যসুন্দর রূপ। বাংলার কাজল দিঘি, কোকিলের গান, সবুজ ফসল ভরা মাঠ, পাহাড়ি পথ কিংবা উচ্ছ্বসিত সমুদ্র—বহুবৈচিত্র্যের সমন্বয়ে যে স্বদেশ, তাকে কবি প্রতীকায়িত করে তুলেছেন স্বাধীন দেশের আপন পতাকায়। এই তিলোত্তমা স্বদেশের অমিত সৌন্দর্যই শত্রুপক্ষকে এদেশ আক্রমণে প্রলুব্ধ করেছে। এ দেশের সাহসী জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধের মুখে শত্রুরা পালাতে বাধ্য হয়েছে। মুক্ত হয়েছে স্বদেশ। নতুন আশায় নতুন দিনের স্বপ্নে বিভোর হয়েছেন কবি। তাঁর একান্ত প্রত্যয়—অনেক রক্তের বিনিময়ে পাওয়া পতাকার মধুর স্পর্শে দূর হয়ে যাবে দেশমাতৃকার সকল বেদনা।

কবিতাটিতে হাসান হাফিজুর রহমান দেশ আর কাঁধে কাঁধ-মেলানো অজস্র মানুষকে একই পতাকার বন্ধনে বাঁধতে চেয়েছেন। আর তাই 'পতাকা' শব্দবন্ধটি এই কবিতায় ঐক্য ও প্রত্যাশা পূরণের প্রতীক। পুরো কবিতাতেই স্বদেশকে শিল্পিত অবয়বে উপস্থাপনের জন্য কবি একের পর এক চিত্রকল্পের মালা গেঁথেছেন। আর শিল্পকৌশলের সুসমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে কবিতাটি উন্নীত হয়েছে নান্দনিক উচ্চতায়।

কবিতাটি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। এতে ৮+১০, ১০+৬ প্রভৃতি বিভিন্ন পর্বের মাত্রা বিভাজন পরিলক্ষিত হয়।

Loading the rest of the chapter…

Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.

Trusted resources

Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.