Bangla Sahityapath chapter 51: I Speak of Legends
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
- Bangla Sahityapath
- Textbook pages 314-319
- 1 source
- 9,596 characters of context
Textbook (verbatim transcription): I Speak of Legends
Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.
Contents6ShowHide
Printed page 314
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
কবি-পরিচিতি
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলায় ১৯৩৪ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করে কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পরে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন এবং সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সরকারের কৃষি ও পানিসম্পদ মন্ত্রী নিযুক্ত হন। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও বেশ কিছুকাল কাজ করেছেন।
তাঁর কবিতায় বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ। লোকসংস্কৃতি, স্বদেশ, সমকাল, ঐতিহ্য ও ইতিহাস-চেতনার সাথে পাঠককে সম্পৃক্ত করতে পারাই আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতার প্রধান গুণ। তাঁর কবিতার ভাষা বাঙালি জীবনের একান্ত ঘরোয়া বাচনভঙ্গি বিশেষত লোকছড়াকে আশ্রয় করেই মূলত গড়ে ওঠে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো – ‘সাতনরী হার’, ‘কখনো রং কখনো সুর’, ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’, ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ প্রভৃতি। ইংরেজি ভাষায়ও তাঁর একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য তাঁকে ১৯৭৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান করা হয়। সাহিত্যকৃতির জন্য তিনি একুশে পদকেও ভূষিত হন।
২০০১ সালের ১৯শে মার্চ আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন।
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল
তাঁর পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত ছিল।
তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন
অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন
পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন
তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।
Printed page 315
আমি উচ্চারিত সত্যের মতো
স্বপ্নের কথা বলছি।
উনোনের আগুনে আলোকিত
একটি উজ্জ্বল জানালার কথা বলছি।
আমি আমার মায়ের কথা বলছি,
তিনি বলতেন প্রবহমান নদী
যে সাঁতার জানে না তাকেও ভাসিয়ে রাখে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে নদীতে ভাসতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মাছের সঙ্গে খেলা করতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে মায়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে পারে না।
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
আমি বিচলিত স্নেহের কথা বলছি
গর্ভবতী বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি।
ভালোবাসা দিলে মা মরে যায়
যুদ্ধ আসে ভালোবেসে
মায়ের ছেলেরা চলে যায়,
আমি আমার ভাইয়ের কথা বলছি।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সন্তানের জন্য মরতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ভালোবেসে যুদ্ধে যেতে পারে না।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে সূর্যকে হৃৎপিণ্ডে ধরে রাখতে পারে না।
আমি কিংবদন্তির কথা বলছি
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।
তাঁর পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত ছিল
কারণ তিনি ক্রীতদাস ছিলেন।
Printed page 316
যে কর্ষণ করে
শস্যের সম্ভার তাকে সমৃদ্ধ করবে।
যে মৎস্য লালন করে
প্রবহমান নদী তাকে পুরস্কৃত করবে।
যে গভীর পরিচর্যা করে
জননীর আশীর্বাদ তাকে দীর্ঘায়ু করবে।
যে লৌহখণ্ডকে প্রজ্বলিত করে
ইস্পাতের তরবারি তাকে সশস্ত্র করবে।
দীর্ঘদেহ পুত্রগণ
আমি তোমাদের বলছি।
আমি আমার মায়ের কথা বলছি
বোনের মৃত্যুর কথা বলছি
ভাইয়ের যুদ্ধের কথা বলছি
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি।
আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি।
সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা
সুপুরুষ ভালোবাসার সুকণ্ঠ সংগীত কবিতা
জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা
রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।
আমরা কি তাঁর মতো কবিতার কথা বলতে পারবো
আমরা কি তাঁর মতো স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো।
[সংক্ষেপিত]
শব্দার্থ ও টীকা
কিংবদন্তি – জনশ্রুতি। লোকপরম্পরায় শ্রুত ও কথিত বিষয় যা একটি জাতির ঐতিহ্যের পরিচয়বাহী।
পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত – মানুষের ওপর অত্যাচারের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে এখানে। সেই অত্যাচারের আঘাত যে এখনও তাজা রয়েছে তা বোঝাতেই রক্তজবার প্রসঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে। আরও লক্ষণীয়, আঘাত রয়েছে পিঠে। অর্থাৎ, শত্রুরা ভীরু কাপুরুষের মতো পিছন থেকে আক্রমণ করেছে কিংবা বন্দি ক্রীতদাসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, মুক্ত মানুষের সঙ্গে সম্মুখ লড়াইয়ের বীরোচিত সাহস দেখায়নি।
Printed page 317
শ্বাপদ – হিংস্র মাংসাশী শিকারি জন্তু।
উনোনের আগুনে আলোকিত
একটি উজ্জ্বল জানালা – আগুনে সবকিছু শুচি হয়ে ওঠে। তাই আগুনের উত্তাপে পরিশুদ্ধ হয়ে সকল গ্লানি মুছে ফেলে আলোয় ভরা মুক্তজীবনের প্রত্যাশা জানাতে উজ্জ্বল জানালার অনুষঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে।
বিচলিত স্নেহ – আপনজনের উৎকণ্ঠা। মুক্তিপ্রত্যাশী মানুষের আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় তাদের স্বজনরা উদ্বিগ্ন হন। ভালোবাসা আর শঙ্কা একসঙ্গে মিশে যায়।
ভালোবাসা দিলে মা মরে যায় – মুক্তি বা স্বাধীনতার প্রয়োজনে কখনো আত্মোৎসর্গ অনিবার্য হয়ে ওঠে। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য ছেড়ে যেতে হয় মাকে। মা ও পরিবারকে ছাপিয়ে দেশের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসাকেই এখানে বোঝানো হয়েছে।
সূর্যকে হৃৎপিণ্ডে ধরে রাখা – সূর্য সকল শক্তির উৎস। তাই এই সর্বশক্তির আধারকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারলে মুক্তি অনিবার্য। কবির মতে, এই সামর্থ্য অর্জনের একমাত্র উপায় হলো কবিতা শোনা; কবিতাকে আত্মস্থ করা। কেননা, কবির কাছে শুধু কবিতাই সত্য আর সত্যই শক্তি।
পাঠ-পরিচিতি
কবিতাটি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ কাব্যের নাম কবিতা। রচনাটিতে বিষয় ও আঙ্গিকগত অভিনবত্ব রয়েছে। আলোচ্য কবিতাটিতে উচ্চারিত হয়েছে ঐতিহ্যসচেতন শিকড়সন্ধানী মানুষের সর্বাঙ্গীণ মুক্তির দৃপ্ত ঘোষণা। প্রকৃতপক্ষে, রচনার প্রেক্ষাপটে আছে বাঙালি সংস্কৃতির হাজার বছরের ইতিহাস; এই জাতির সংগ্রাম, বিজয় ও মানবিক উত্তরণের অনিন্দ্য অনুষঙ্গসমূহ। তিনি এই কবিতায় পৌনঃপুনিকভাবে মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। কবির একান্ত প্রত্যাশিত মুক্তির প্রতীক হয়ে উপস্থাপিত হয় একটি বিশেষ শব্দ ‘কবিতা’। কবি তাঁর পূর্বপুরুষের সাহসী ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তাঁর বক্তব্যকে এগিয়ে নিয়ে চলেন। কবির বর্ণিত এই ইতিহাস মাটির কাছাকাছি মানুষের ইতিহাস; বাংলার ভূমিজীবী অনার্য ক্রীতদাসের লড়াই করে টিকে থাকার ইতিহাস। ‘কবিতা’ ও সত্যের অভেদকল্পনার মধ্য দিয়ে কবি নিয়ে আসেন মায়ের কথা, বোনের কথা, ভাইয়ের কথা, পরিবারের কথা। কবি এ-ও জানেন মুক্তির পূর্বশর্ত যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে পরিবার থেকে দূরে সরে যেতে হয়। ভালোবাসার জন্য, তাদেরকে মুক্ত করবার জন্যই তাদের ছেড়ে যেতে হয়। এই অমোঘ সত্য কবি জেনেছেন আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস থেকে।
কবিতাটির রসোপলব্ধির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এর আঙ্গিক বিবেচনা। এক্ষেত্রে, প্রথমেই যে বিষয়টি পাঠককে নাড়া দেয় তা হলো, একই ধাঁচের বাক্যের বারংবার ব্যবহার। কবি একদিকে ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ পঙ্ক্তিটি বারংবার প্রয়োগ করেছেন, অপরদিকে ‘যে কবিতা শুনতে জানে না/ সে…’ কাঠামোর পঙ্ক্তিমালার ধারাবাহিক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে কবিতা আর মুক্তির আবেগকে একত্রে শিল্পরূপ প্রদান করেছেন। এখানে ‘কিংবদন্তি’ শব্দটি হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যের প্রতীক। কবি এই নান্দনিক কৌশলের সঙ্গে সমন্বিত করেছেন
Printed page 318
গভীরতাসঞ্চারী চিত্রকল্প। একটি কবিতার শিল্পসার্থক হয়ে ওঠার পূর্বশর্ত হলো হৃদয়স্পর্শী চিত্রকল্পের যথোপযুক্ত ব্যবহার। চিত্রকল্প হলো এমন শব্দছবি যা কবি গড়ে তোলেন এক ইন্দ্রিয়ের কাজ অন্য ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে করিয়ে কিংবা একাধিক ইন্দ্রিয়ের সম্মিলিত আশ্রয়ে; আর তা পাঠক-হৃদয়ে সংবেদনা জাগায় ইন্দ্রিয়াতীত বোধের প্রকাশসূত্রে। চিত্রকল্প নির্মাণের আরেকটি শর্ত হলো অভিনবত্ব। এ সকল মৌল শর্ত পূরণ করেই আলোচ্য কবিতায় চিত্রকল্পসমূহ নির্মিত হয়েছে। কবি যখন বলেন— ‘কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা’; তখন ইন্দ্রিয় থেকে ইন্দ্রিয়াতীতের দ্যোতনাই সঞ্চারিত হয়। নিবিড় পরিশ্রমে কৃষকের ফলানো শস্য একান্তই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য একটি অনুষঙ্গ। কিন্তু এর সঙ্গে যখন কবিতাকে অভেদ কল্পনা করা হয় তখন কেবল ইন্দ্রিয় দিয়ে একে অনুধাবন করা সম্ভব হয় না। সার্বিক বিবেচনায় কবিতাটি বিষয় ও আঙ্গিকের সৌকর্যে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সংযোজন।
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত।
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১. কবির পূর্বপুরুষের করতলে কিসের সৌরভ ছিল?
ক. রক্তজবার খ. পলিমাটির
গ. শস্যদানার ঘ. শ্বাপদের
২. ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ বলতে কবি বোঝাতে চেয়েছেন—
i. বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য
ii. বাঙালির সুদীর্ঘকালের শোষণ-বঞ্চনার ইতিকথা
iii. অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঙালির শাশ্বত প্রতিবাদী সত্তা
নিচের কোনটি ঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii
উদ্দীপকটি পড়ে ৩ ও ৪ সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দাও।
আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই
আমি আমার আমিকে চিরদিন– এই বাংলায় খুঁজে পাই
আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর
আমি এই বাংলার মায়া ভরা পথে, হেঁটেছি এতটা দূর
বাংলা আমার জীবনানন্দ, বাংলা প্রাণের সুখ
আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।
৩. কবিতাংশের ‘বাংলা আমার জীবনানন্দ’– এর সাথে ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ কবিতার সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয় হলো–
i. ইতিহাসমনস্কতা
ii. ঐতিহ্যপ্রিয়তা
iii. সংগ্রামশীলতা
Printed page 319
নিচের কোনটি ঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii
৪. উদ্দীপকের মূল বক্তব্য ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ কবিতার কোন পঙ্ক্তিতে ব্যক্ত হয়েছে?
ক. সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা
খ. সুপুরুষ ভালোবাসার সুকণ্ঠ সংগীত কবিতা
গ. আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি
ঘ. যে কর্ষণ করে। শস্যের সম্ভার তাকে সমৃদ্ধ করবে
Loading the rest of the chapter…
Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.
Trusted resources
Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.