Bangla Sahityapath chapter 56: Landless Farmer Wishes
ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছে তার
- Bangla Sahityapath
- Textbook pages 336-340
- 1 source
- 7,814 characters of context
Textbook (verbatim transcription): Landless Farmer Wishes
Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.
Printed page 336
ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছে তার
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
কবি-পরিচিতি
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান যশোর জেলা শহরের পশ্চিম প্রান্তে খড়কি গ্রামে ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ শাহাদাৎ আলী এবং মায়ের নাম রাহেলা খাতুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মান ও এর পরের বছর এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে শিক্ষকতায় যোগদান করেন। ১৯৬৯-৭০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করেন। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে তিনি যুক্ত ছিলেন।
ছাত্রজীবন থেকেই স্বদেশ ও সমকাল সচেতন এই কবির সাহিত্য-প্রতিভার সবিশেষ পরিচয় পাওয়া যায়। ঋজু বক্তব্য, ছন্দ সচেতনতা এবং গীতিময়তা তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে একুশে পদকে ভূষিত হন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— ‘দুর্লভ দিন’, ‘শঙ্কিত আলোকে’, ‘বিপন্ন বিষাদ’, ‘প্রতনু প্রত্যাশা’, ‘ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছে তার’, ‘ধীর প্রবাহে’ প্রভৃতি।
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
নদীর ধসের নিচে
বাতাসের মধ্যে আছে
কিছুটা আশ্রয়;
গানের বদলে পাখি চুপিসারে কথা বলে
শঙ্খের পরিভাষা শিখে,
ঢেউ হয়ে গেছে বালুময়।
ভেসে যাওয়া ডালপালা কুড়িয়ে কাড়িয়ে
আগুন জ্বালিয়ে তার পাশে বসে আছে
ভূমিহীন কৃষিজীবী, ইচ্ছে তার
জেলে হয়ে কিছু মাছ ধরে।
কোনো কোনো দিন যখন জলের তোড়
পাড় ভেঙে ঢুকে পড়ে ক্ষেতের উজানে
ফাটলে, দলিত ঘাস ফসলের শোভা ঠোঁটে
Printed page 337
আবার সে ফিরে যায় কাদায় অক্ষর আঁকে দিয়ে;
তখন সে মাছ খোঁজে কাদাখোঁচা পাখির মতন।
সব মাঠ, হলুদ সবুজ কালো ফসলের সব মাঠ,
সময়ের প্রতীক্ষায় থাকে শুধু।
কখন মেঘের রঙ সাদা থেকে কালো হবে
জমে উঠবে মেঘের পাহাড়
কখন ক্ষেতের কাজ শুরু হবে কৃষকের
সময়ের প্রতীক্ষায় থাকা শুধু।
লাঙল নিড়ানি রেখে এখন কেবল
কোঁচ হাতে গোঁজ হয়ে মাছরাঙা গামছা পরে
একঠ্যাঙা বগের মতন চেয়ে থাকে।
মাটির টিলার পরে তার ঘরে
ঢিলাঢালা ফতুয়ার মধ্যে বসে
মাছভাত খেতে খেতে একদিন
আকালের গল্পকথা বলাবলি করবে তার স্বজনের সাথে
এই স্বপ্ন চোখে নিয়ে
প্রতীক্ষায় থাকা শুধু
মাছরাঙা গামছা পরে একঠ্যাঙা বগের মতন।
চোখের লবণ জমে চোখ জ্বলে
শুধু জ্বলে। কোঁচ হাতে গোঁজ হয়ে
সময়ের প্রতীক্ষায় থাকা শুধু।
শব্দার্থ ও টীকা
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| ধস | পাহাড়, নদীর পাড় প্রভৃতি থেকে মাটি বা পাথর খসে পড়া। |
| জলের তোড় | জলের চাপ। |
| দলিত ঘাস ফসলের শোভা ঠোঁটে আবার সে ফিরে যায় | |
| কাদায় অক্ষর আঁকে দিয়ে | জলে ঘাস ফসল ডুবে যাওয়ার পর যখন জল নেমে যায় তখন বেরিয়ে আসা কর্দমাক্ত ভূমির বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। |
Printed page 338
| শব্দ | অর্থ |
|---|---|
| কাদাখোঁচা | এক ধরনের পাখি। |
| হলুদ সবুজ কালো ফসলের সব মাঠ | সবুজ ফসল থাকে, পেকে সোনালি বা হলুদ হয়, ফসল কাটার পর নাড়া পোড়ালে মাঠ কালো বর্ণ ধারণ করে। |
| কোঁচ | মাছ-শিকারের জন্য লোহার ছুঁচালো ফলা লাগানো হাতিয়ার বিশেষ। |
| চোখের লবণ জমে চোখ জ্বলে | কৃষকের বেদনাকে বোঝানো হয়েছে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে কৃষক জেলে হয়েছে। তবু তার কষ্ট লাঘব হয় না। মাছের জন্যও তাকে প্রতীক্ষা করেই যেতে হয়। এই কষ্টের জীবন তাকে অশ্রুসিক্ত করে তোলে। |
পাঠ-পরিচিতি
কবিতাটি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছে তার’ গ্রন্থ থেকে সংকলন করা হয়েছে। প্রকৃতিনিবিড় মানুষের পরিবর্তমান জীবনপ্রবাহের এক নান্দনিক স্বপ্ন-উপাখ্যান এই কবিতাটি। জলবেষ্টিত এই বাংলার জনপদের একজন সাধারণ কৃষিজীবী মানুষের কথা আছে এতে, আছে তার স্বপ্নসাধ। জলের তোড়ে এই কৃষক হয়ে ওঠে ভূমিহীন। কিন্তু আশাবাদী মানুষের এই দেশে সহজে কেউ হতোদ্যম হয় না। তাই ভূমি হারানো এই মানুষটি জলকে ঘিরেই বাঁচতে চায়। সে জেলে হতে চায়। খড়কুটো ডালপালা আশ্রয় করে আগুন জ্বালিয়ে সে জীবনের উত্তাপকে ফিরে পেতে চায়। এরই সঙ্গে সে মিলিয়ে নেয় তার চাওয়া—জেলে হয়ে মাছ ধরার। কেননা, জলমগ্ন এই চারপাশ ভূমিকর্ষণের অনুপযোগী। তাকে প্রতীক্ষা করতে হয় ভাবী সময়ের জন্য। আর এই অন্তর্বর্তী সময়ে সেই কৃষক বরণ করে নিতে চায় জেলেজীবন। জীবিকার এই রূপান্তর তাকে স্বপ্নশূন্য করে না। সে সুন্দর ভবিষ্যতের কল্পনায় বিভোর হয়। বিগত কষ্টের দুঃখস্মৃতি রোমন্থনের মধ্যে যে আনন্দ লুকিয়ে থাকে সেই আনন্দ এই কৃষকও একদিন লাভ করবে— এই আশা নিয়ে কবিতার এই কৃষক তার জীবনকে সজীব করে রাখে। সে মাছ ধরার প্রতীক্ষা করে। কিন্তু কবি এই সরল কাঠামোয় কবিতাটি বিন্যস্ত করেন না। তাঁর বোধের বহুমাত্রিকতায় উল্লিখিত ভূমিহীন কৃষককে পাখির আদল দিতে চান। মূলত পাখির প্রতীকেই কবি কৃষক চরিত্রটিকে রূপায়ণ করেন। তাই নদীর জলে ভূমি নিমজ্জিত হলে সেই কৃষক বাতাসে আশ্রয় খোঁজে; ঠিক যেমন একটি পাখি ডানা এলিয়ে ভেসে বেড়ায় বাতাসে। শুধু তাই নয়, ওই কৃষক তখন পাখির ভাষাও বোঝে। তাই পাখির কূজনকে তখন গান মনে না হয়ে কথোপকথন বলেই তার বোধ হয়। আবার মাছরাঙা পাখির মতোই তার পোশাক, বকের ভঙ্গিতেই চলে তার মাছ ধরার প্রতীক্ষা। এভাবে পাখির সঙ্গে মিশে যায় সেই ভূমিহীন কৃষিজীবীর আপাত-উন্নুলিত জীবন। পাখির ভূমিতে আশ্রয় হয় না, এই কৃষকের ভূমিনির্ভর আশ্রয় হারিয়ে গেছে। মৎস্য শিকারি মাছরাঙা কিংবা বক যেমন করে মাছের প্রতীক্ষা করে, এই কৃষকও তেমনি জেলেজীবন গ্রহণ করে মাছের অপেক্ষা করে। এত যে পরিবর্তন, জীবনকাঠামোর রূপান্তর—এসব সত্ত্বেও ওই মানুষটি প্রকৃতিলগ্ন হয়ে বেঁচে থাকে, স্বপ্ন দেখে, অমিত জীবনীশক্তির উদ্বোধন ঘটায়। এই অনিঃশেষ প্রাণময়তাকেই কবি উপস্থাপন করেন আলোচ্য কবিতায়।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত কবিতাটিতে কবি পর্ব নির্মাণে প্রয়োজন অনুসারে স্বাধীনতা গ্রহণ করেছেন। আবার ব্যতিক্রমী চরণ বিন্যাসের কারণেও ছন্দের দোলায় বিশেষত্ব যোজিত হয়েছে।
Printed page 339
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১. ‘ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছে তার’ কবিতায় ভূমিহীন কৃষিজীবীর কী ইচ্ছে জাগে?
ক. জেলে হয়ে মাছ ধরার
খ. সময়ের প্রতীক্ষায় থাকার
গ. চুপিসারে কথা বলার
ঘ. আকালের গল্প বলার
২. ভূমিহীন কৃষিজীবী লোকটিকে “মাছরাঙা গামছা পরে একঠ্যাঙা বগের মতন।” কল্পনা করার কারণ হলো—
i. প্রাকৃতিক বৈরিতায় তার অসহায়ত্ব
ii. বিপর্যস্ততায় নবজীবনের আশাবাদ
iii. রূপান্তরের সাথে অভিযোজন প্রয়াস
নিচের কোনটি ঠিক?
ক. i ও ii
খ. i ও iii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii
অনুচ্ছেদটি পড়ে ৩ ও ৪ সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দাও।
কত কথা আজ মনে পড়ে তার, গরিবের ঘর তার,
ছোটোখাটো কত বায়না ছেলের পারে নাই মিটাবার।
৩. ‘ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছে তার’ কবিতার যে ভাবের প্রতিফলন উদ্দীপকে ঘটেছে, তা হলো—
ক. বিলাসী জীবন
খ. সংগ্রামশীলতা
গ. সুখের আশাবাদ
ঘ. দুঃখভারাক্রান্ত জীবন
৪. উদ্দীপকে উল্লিখিত চেতনার দিকটি যে চরণে প্রকাশ পেয়েছে তা হলো—
ক. নদীর ধসের নিচে/বাতাসের মধ্যে আছে/কিছুটা আশ্রয়;
খ. আগুন জ্বালিয়ে তার পাশে বসে আছে/ভূমিহীন কৃষিজীবী,
গ. চোখের লবণ জমে চোখ জ্বলে/শুধু জ্বলে।
ঘ. ...মাছরাঙা গামছা পরে/একঠ্যাঙা বগের মতন চেয়ে থাকে।
Printed page 340
সৃজনশীল প্রশ্ন
গ্রামের পর গ্রাম কাল-কলেরায় উজাড়!
নিরীহ তালেব মাস্টারের বুকেও বজ্র পড়ল! কলেরায়
ছেলেটি মারা গেল বিনা পথ্যে, বিনা শুশ্রূষায়!
কাফনের কাপড় জোটেনি, তাই বিনা কাফনে
বাইশ বছরের বুকের মানিককে কবরে শুইয়ে দিয়েছি এখানে!
এই-ই শেষ নয়– শুনুন : বলি
মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছিলাম পলাশতলী
সেখানেও আকাল! মানুষে মানুষ খায়।
তিনদিনের উপবাসী আর লজ্জাবস্ত্রহীন হয়ে নিদারুণ ব্যথায়
দড়ি কলসি বেঁধে পুকুরের জলে ডুবে মরেছিল একদিন সন্ধ্যায়।
ক. ‘ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছে তার’– কবিতার ভূমিহীন কৃষিজীবী ঢিলাঢালা ফতুয়ার মধ্যে বসে কী খায়?
খ. ‘সময়ের প্রতীক্ষায় থাকা শুধু’– বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
গ. তালেব মাস্টারের জীবনচিত্র ‘ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছে তার’ কবিতার কৃষিজীবীর সাথে কোনদিক থেকে
সাজুয্যপূর্ণ তা ব্যাখ্যা করো।
ঘ. “সাজুয্যপূর্ণ হলেও ‘ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছে তার’ কবিতার কৃষিজীবীর মতো তালেব মাস্টার অভিযোজন
প্রয়াসী নন।”– এই মন্তব্যের যৌক্তিকতা বিচার করো।
সমাপ্ত
Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.
Trusted resources
Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.