Skip to content

Ananda Path chapter 10: Nature of England

বিলাতের প্রকৃতি

  • Ananda Path
  • Textbook pages 54-60
  • 1 source
  • 9,165 characters of context

Textbook (verbatim transcription): Nature of England

Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.

Contents4

Printed page 54

ভ্রমণ-কাহিনি

বিলাতের প্রকৃতি

মুহম্মদ আবদুল হাই

বৃষ্টি-নেশাভরা লন্ডনের সন্ধ্যাবেলায় ছোট্ট ঘরটিতে বসে জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছি। যতদূর চোখ যায় শুধু দেখছি, লন্ডনের বাড়িঘরগুলোর চিমনি থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। ধোঁয়ায় আর মেঘঢাকা লন্ডন পাথরের মতো বুকের ওপর চেপে বসেছে। মনে মনে ফিরে গেলাম আট হাজার মাইল দূরে, রাজশাহীর যে বাসাটায় আমার পরিজনেরা বাস করছে সেখানে। ওখানে হয়তো এরও চেয়ে ঘনকালো মেঘ করেছে। বাংলাদেশের আষাঢ়ের মেঘ— যেমন গম্ভীর তেমনি কালো।হয়তো নেমেছে ঘন বর্ষা। অবিরল ধারাবর্ষণের মধুর রোল গানের অনুরণনের মতো কেঁপে কেঁপে তাদের হয়তো নিদ্রাকাতর করে দিয়েছে।

Printed page 55

মা, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমির মতো আর কিছু কি এমন মিষ্টি আছে? সে জন্যই বাংলাদেশের কথা বলতে গিয়ে বাংলার কবি লিখেছেন—

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি।

গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত— এ ছয় ঋতুর লীলা আমাদের দেশে। কিন্তু এখানে শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা ছাড়া শরৎ, হেমন্ত ও বসন্ত কখন আসে, কখন যায় তা চোখেই পড়ে না।

ইংল্যান্ডের বসন্তকাল কিন্তু ভিন্ন ধরনের। মার্চ মাস শেষ হতে-না-হতেই তরুলতায় পাতার মুকুল দেখতে পেলাম। আজ এ গাছে চাইতেই দেখি, যেখানে যতটুকু পাতা বেরোনো সম্ভব তাতেই অঙ্কুর গজিয়ে উঠেছে। কাল যদি খেয়াল করি তো দেখি, আরও বেড়ে গেছে। সন্ধ্যায় একরকম দেখি তো সকালে অন্যরকম। আরও সুন্দর, আরও ভালো। প্রকৃতির যে দিকে চাই সেদিকেই দেখি, যেন সুন্দরের আগুন লেগে আছে।

ছোটো ছোটো গাছে পাতা নেই। শুধু ফল। অনাবিল সৌন্দর্যের এই খেলা দেখবার জন্য এখানকার পার্কগুলো। ডালপালার হাত-পা মেলে দেওয়া আমাদের মাথাসমান উঁচু ফুলের গাছ সারি সারি সাজানো। কতকগুলোতে শুধু সাদা ফুল। কতকগুলোতে লাল, নীল, হলদে, বেগুনি। ভারি ভালো লাগে তার নিচে গিয়ে দাঁড়াতে।

রিজেন্ট পার্ক আমার বাসা থেকে মিনিট তিনেকের পথ। প্রকৃতির সৌন্দর্যের দিক দিয়ে এটি লন্ডনের সেরা পার্ক। এ পার্কের গোলাপ-বাগানের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। বাগানটি রানি মেরির নামের সঙ্গে জড়ানো। জুন, জুলাই— এ দুমাস গোলাপফুলের। মেরির গোলাপ-বাগানের গোলাপেরা কেউ ফুটেছে—কেউবা ফুটে রৌদ্র-স্নানরত নরনারীর চোখ জুড়াচ্ছে, মন ভোলাচ্ছে। নানা রঙের এত গোলাপ একসঙ্গে পাশাপাশি ফুটতে দেখলে নিতান্ত বেরসিকের প্রাণও রসোচ্ছল হয়ে উঠবে তাতে বিচিত্র কী? রোদে ভরা ছুটির দিনগুলোতে রিজেন্ট পার্ক ও কিউ-গার্ডেনে এখানকার মালিদের হাতে-গড়া গোলাপবাগের জান্নাতি পরিবেশ দেখে মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। অপরিমেয় ফুলের রঙে চোখে লাগছে নেশা আর ফুলেরই মনোরম স্নিগ্ধ গন্ধে বাতাস হয়েছে মোহকর।

Printed page 56

বসন্ত ও গ্রীষ্মের এক এক মাসে এক এক রকম ফুল এখানকার বৈশিষ্ট্য। আবার একই ফুলের কত যে বৈচিত্র্য তা বলে শেষ করা যায় না। এপ্রিল মাসে দেখলাম লাইলাক ফুলে রিজেন্ট পার্ক ছেয়ে গেছে। বেগুনি আর আসমানি রঙের লাইলাক। ইংল্যান্ডের এত ফুলের মধ্যে শুধু লাইলাকেই গন্ধ পেলাম।

মে মাস ছিল টিউলিপ, উইলো আর ডেইজির। টিউলিপ আমাদের দেশের ধুতুরা ফুলের মতো। কেবল ফুলটুকু ছাড়া আর কিছুর সঙ্গে ওর সাদৃশ্য আঁকা যাবে না— পাতার সঙ্গে নয়, পাপড়ি বা দল কিছুরই সঙ্গে নয়। বাইরে কিছুটা সাদৃশ্য আছে, এতটুকু বলা যায়। আকারে টিউলিপ ধুতুরা ফুলের চেয়ে অনেক ছোটো। বলিহারি যাই টিউলিপের রং দেখে। কোনো জায়গায় দুধের চেয়েও সাদা। কোনো জায়গায় রক্তের চেয়ে লাল। কোনোটায় বেগুনি, কোনোটায় জাফরানি, কোনোটায় ধুপছায়া। কোনোটা দুধে-আলতা মাখানো। কোনোটা হলুদ।

কোনোটায় থাকে প্রজাপতির গায়ের রেখাটানা বিচিত্র রঙের কারুচিত্র। থাকের পর থাক। টিউলিপে টিউলিপময়। ইংরেজজাত ফুলের যে কী ভক্ত এবং ফুলের রঙে যে এদের কী আনন্দ এ থেকে এ কথাই বারবার মনে পড়ে।

মাটিতে যেদিকে চাইছি— দেখছি ঘাসেও ফুল। সবার পিছে, সবার নিচে, সবহারাদের মাঝে ঘাস এখানে ছোটো হয়ে নেই। সবার আনন্দের ভাগ সে-ও যাতে ভোগ করতে পারে তার জন্য তারও বুক ফুলে ভরে রয়েছে। এই ঘাসফুলের অণু-পরমাণুগুলোর নাম ডেইজি। আর মেয়েদের কানফুলের মতো যেগুলো সেগুলো ক্রোকাস। মিষ্টতায় ভরা ফুলগুলো।

এপ্রিল, মে ও জুন এই তিন মাসে ইংল্যান্ডের সৌন্দর্য চোখ ভরে দেখেছি। এপ্রিলে এর সূচনা আর সেপ্টেম্বরে পরিণতি। জুন-জুলাই-আগস্ট এখানকার গরমকাল। কিন্তু মে মাস থেকে ইংল্যান্ডের প্রকৃতিতে এ কী শুরু হলো! আমাদের সবুজ এদেশের সবুজের কাছে ফিকে হয়ে যায়। আমাদের ধানখেতের ওপর দিয়ে বাতাস যখন ঢেউ খেলে যায়,তখন হাল্কা মনোহর সবুজের কম্পন মাঠের প্রত্যন্ত প্রদেশে পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে দেখি। তাতে মন ভরে। চোখ জুড়ায়। এদের ধানখেত নেই, কেননা ভাত এদের খাবার নয়। পার্কে সবুজ আর নীল দৃশ্য দেখে লোভ হলো এদের গ্রাম আর মাঠের শোভা দেখতে।

Printed page 57

কোচে চড়ে সেদিন ক্যামব্রিজ বেড়িয়ে এলাম। আমাদের দেশের গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ আমাদের মন ভুলায়, কিন্তু এদেশের মাঠের মাঝখান দিয়ে পিচঢালা পথের বুকের ওপর দিয়ে বাদশাহি কোচগাড়ি যখন ছুটে চলে, তখন দুপাশের গাছপালার সবুজ ফুলের অনন্ত বৈচিত্র্য আর লতাপাতার ঘন নীলিমা চোখের ওপর মধু-মায়া অঞ্জন লাগিয়ে দিয়ে যায়। দিগন্ত-বিস্তৃত মাঠ। খাড়া-উঁচু, সোজা-নিচু বা একটানা সমতল নয়। তাতে কোথাও বাজরার খেত। কোথাও সরিষার ফুলের মতো সারা মাঠ ছড়ানো ফিকে আর গাঢ় হলুদের বিছানা পাতা। তার পাশে গোচারণভূমি। তার নিচে বহু বিচিত্র শস্যখেত। অপরূপ শ্যামলে-সবুজে, বেগুনে-হলুদে, নীলে-লালে আর বিচিত্র আভায় প্রভায় গায়ে গায়ে লেগে থেকে সৌন্দর্যের সে কী প্লাবন বইয়ে দিচ্ছে। প্রকৃতির এত রূপ, এত নিটোল স্বাস্থ্য, মে-জুনের ইংল্যান্ড না-দেখলে কখনও কি তা বিশ্বাস করা যায়?

সে যা হোক। সূর্যের স্নিগ্ধ রোদে কদিন থেকে সারা ইংল্যান্ড বিধৌত হচ্ছে। এ মাসটা ধরেই দেখছি প্রতি শনি-রবিবারে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ির কর্তা-গিন্নি থেকে আরম্ভ করে ছোটো কচি বাচ্চারা পর্যন্ত পার্কে এসে রোদ পোহাচ্ছে। রোদ স্বাস্থ্যের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। সূর্য যখন এতকালের কৃপণতার পর মাসখানেক ধরে অকৃপণভাবে আলো দিতে লেগেছে তখন তার কিরণ তো মন প্রাণ-ভরে পান করা চাই।

প্রকৃতিতে যখন এমন সৌন্দর্যের সমারোহ, বিচিত্র রঙে যখন সারা ইংল্যান্ড রাঙা হয়ে উঠল, সবুজে-নীলে মিতালি-পাতানো যখন স্বদেশিদের তো বটেই, আমাদের মতো বিদেশিদের মনেও এদেশকে ভালোবাসার নেশা জাগল। তাই বুঝি ইংল্যান্ডে এত পার্ক। এত ফুল। এত বিশ্রামকুঞ্জ। আর গ্রীষ্মকালকে কেন্দ্র করে জীবনের এত আয়োজন। ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মকালের খ্যাতি দুনিয়াজোড়া। শীতের মতো শুষ্ক বলে নয়, স্নিগ্ধ রোদে-ভরা মধুর বলে।

লেখক-পরিচিতি

মুহম্মদ আবদুল হাই ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। 'ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব' মুহম্মদ আবদুল হাই রচিত ভাষাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এছাড়াও 'সাহিত্য ও সংস্কৃতি', 'তোষামোদ ও রাজনীতির ভাষা', 'ভাষা ও সাহিত্য', 'বিলাতে সাড়ে সাতশ দিন' প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁর মেধা ও মননের সাক্ষ্য বহন করে। প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক গ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

Printed page 58

পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব

রচনাটি মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের 'বিলাতে সাড়ে সাতশ দিন' গ্রন্থের অংশবিশেষ। এখানে লন্ডনের মনোরম প্রকৃতি চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমে চিমনির ধোঁয়া আর মেঘে ঢাকা লন্ডন লেখকের মন বিষাদে ভরে দিলেও ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডের প্রকৃতির অপরূপ শোভা সেই বিষণ্ণতা কাটিয়ে তাঁকে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে। প্রকৃতিতে শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা— এই তিন ঋতুর প্রাধান্য থাকলেও ভিন্ন ধরনের এক বসন্তকাল এখানে চোখে পড়ে। বসন্তকালে ইংল্যান্ডের প্রকৃতি লেখকের ভাষায় 'সুন্দরের আগুন'। রিজেন্ট পার্ক সৌন্দর্যের দিক থেকে ইংল্যান্ডের সেরা পার্ক। যেখানে গোলাপের সৌন্দর্য দেখলে যে-কোনো বেরসিকের প্রাণেও রসের সঞ্চার হবে। লাইলাক, টিউলিপ, উইলো, ডেইজি প্রভৃতি বিচিত্র ফুলের সমারোহ ইংল্যান্ডকে করেছে আকর্ষণীয়। মে ও জুন মাসে শস্যক্ষেতের বিচিত্র রূপ যেন সৌন্দর্যের প্লাবন বইয়ে দেয়। আবার শীতের অবসানে গ্রীষ্মের আকাশে যখন সূর্যের উদয় হয়, তখন ইংল্যান্ডের সব-বয়সি মানুষ স্নিগ্ধ রোদ পোহায়। সব মিলিয়ে নানা ঋতুর বিচিত্র রূপ, সাজানো পার্ক আর পার্কের নানা জাতের ফুলের সমারোহ বিলেতের প্রকৃতিকে মনোহর করে তোলে।

প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও মুগ্ধতা সহজাত। রচনাটিতে সে ভালোবাসা ও মুগ্ধতার প্রকাশ সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

শব্দার্থ ও টীকা

চিমনি — ধোঁয়া বের হওয়ার নল বা চোঙা।
পরিজন — স্বজন। পরিবারের লোক।
ধারাবর্ষণ — বৃষ্টি।
অনুরণন — কম্পন।
নিদ্রাকাতর — ঘুমে কাতর।
তরুলতা — গাছের লতা।
অঙ্কুর — মুকুল, কলি।
অনাবিল — স্বচ্ছ, অকলুষিত।

Printed page 59

রৌদ্র-স্নানরত — রোদ পোহানো।
বেরসিক — রসহীন লোক।
রসোচ্ছল — রসে ভরা।
রিজেন্ট পার্ক — লন্ডন শহরের একটি পার্ক।
কিউ-গার্ডেন — লন্ডনের একটি পার্কের নাম।
জান্নাত — বেহেশত, স্বর্গ।

অপরিমেয় — অগণিত।
মনোরম — সুন্দর।
মোহকর — মুগ্ধতা তৈরি করে এমন।
সাদৃশ্য — একই রকম।
বলিহারি — ভাষা হারিয়ে ফেলা।

জাফরানি — রঙের নাম।
ধুপছায়া — রোদ ও ছায়ার মিশ্রণ।
কারুচিত্র — কাঠে খোদাই করা ছবি।
কানফুল — কানের অলংকার।
ফিকে — ঝাপসা হয়ে যাওয়া।
ক্যামব্রিজ — লন্ডনের অদূরে একটি স্থানের নাম। এ নামে স্থাপিত হয়েছে বিখ্যাত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়।

কোচগাড়ি — একধরনের গাড়ি।
অঞ্জন — কাজল।
দিগন্ত বিস্তৃত — শেষপ্রান্ত পর্যন্ত।
বাজরা — এক প্রকার শস্য।
গোচারণভূমি — যেখানে গরু চরানো হয়।
প্লাবন — বন্যা।
বিধৌত — বিশেষভাবে ধোয়া হয়েছে এমন।
মিতালি — বন্ধুত্ব।
বিশ্রামকুঞ্জ — বিশ্রামের স্থান।

Printed page 60

Loading the rest of the chapter…

Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.

Trusted resources

Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.