Ananda Path chapter 1: The Parrots Tale
তোতা-কাহিনি
- Ananda Path
- Textbook pages 1-5
- 1 source
- 9,368 characters of context
Textbook (verbatim transcription): The Parrots Tale
Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.
Contents3ShowHide
Printed page 1
তোতা-কাহিনি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১.
এক যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, কিন্তু জানিত না কায়দা-কানুন কাকে বলে।
রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’
মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’
২.
রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।
পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।
সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে, সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া। রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।
৩.
স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ ।’ কেহ বলে, ‘শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল !’
স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।
Printed page 2
পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ‘অল্প পুথির কর্ম নয়।’
ভাগিনা তখন পুথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, ‘সাবাস! বিদ্যা আর ধরে না।’
লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।
অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করার ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ‘উন্নতি হইতেছে।’
লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্দুক বোঝাই করিল।
তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠা-বালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।
৪.
সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, ‘খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।’
কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি !’
ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।’
জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।
৫.
শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।
দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরি ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।
ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ কাণ্ডটা দেখিতেছেন !’
মহারাজ বলিলেন, ‘আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।’
ভাগিনা বলিল, ‘শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।’
রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ‘মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি ।’
রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, ‘ওই যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’
ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, ‘পাখিটাকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’
দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল
Printed page 3
রাশি রাশি পুথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চিৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।
এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।
৬.
পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝটপট করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।
কোতোয়াল বলিল, ‘এ কী বেয়াদবি !’
তখন শিক্ষামহলে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।
রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।’
তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।
কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।
৭.
পাখিটা মরিল। কোনকালে যে কেউ তার ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্মীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’
ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি !’
ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’
রাজা শুধাইলেন, ‘ও কি আর লাফায় ।’
ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম !’
‘আর কি ওড়ে ।’
‘না ।’
‘আর কি গান গায় ।’
‘না ।’
‘দানা না পাইলে আর কি চেঁচায় ।’
‘না ।’
রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি ।’
পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল।
রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুথির শুকনো পাতা খসখস গজগজ করিতে লাগিল।
বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণ হাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।
Printed page 4
লেখক-পরিচিতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২৫শে বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দে (৭ই মে ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। বাল্যকালেই তাঁর কবিপ্রতিভার উন্মেষ ঘটে। তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, গীতিকার, সুরকার, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, গান অর্থাৎ সাহিত্যের প্রায় সকল শাখাই তাঁর অবদানে সমৃদ্ধ। তাঁর অজস্র রচনার মধ্যে ‘মানসী’, ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, ‘কল্পনা’, ‘বলাকা’, ‘পুনশ্চ’, ‘চোখের বালি’, ‘গোরা’, ‘ঘরে-বাইরে’, ‘শেষের কবিতা’, ‘বিসর্জন’, ‘ডাকঘর’, ‘রক্তকরবী’, ‘গল্পগুচ্ছ’, ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’, ‘কালান্তর’ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এশীয়দের মধ্যে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ২২শে শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে (৭ই আগস্ট ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ) আশি বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
পাঠ-পরিচিতি ও মূলভাব
একবার ‘মূর্খ’ তোতা পাখির শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন রাজা। রাজার ভাগিনাদের ওপর দেওয়া হলো সেই শিক্ষার ভার। ডাকা হলো রাজপণ্ডিতদের। নানা আলোচনা শেষে তারা সিদ্ধান্ত জানালেন, সামান্য খড়কুটো দিয়ে পাখিটি যে-বাসা বাঁধে, সে-বাসা অধিক বিদ্যাধারণের উপযুক্ত নয়। তাই রাজপণ্ডিতদের পরামর্শ অনুযায়ী পাখির জন্য নির্মিত হলো সোনার খাঁচা। অপূর্ব সে খাঁচা দেখার জন্য দেশ-বিদেশের লোক ঝুঁকে পড়ল। এরপর পণ্ডিত মশাই এলেন পাখিকে বিদ্যা শেখাতে। পুথি-লেখকরা পুথির নকল করে করে বিশাল স্তূপ তৈরি করল। বিদ্যাশিক্ষার পাশাপাশি চলল খাঁচাটার মেরামত ও মেরামতের তদারকি। পাখির শিক্ষা-কার্যক্রম স্বচক্ষে দেখতে চাইলেন রাজা। পাত্র-মিত্র-অমাত্য নিয়ে রাজা শিক্ষাশালায় উপস্থিত হলেন। অমনি বেজে উঠল নানা বাদ্যযন্ত্র। রাজার শিক্ষাশালায় আসার মূল উদ্দেশ্যই ঢাকা পড়ে গেল রাজাকে স্বাগত জানাবার এমন হুলুস্থুল আয়োজনে। এদিকে, শিক্ষার চাপে পাখিটি ধীরে ধীরে আধমরা হয়ে এল। একদিন দেখা গেল, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়ে খাঁচার শিক কাটবার চেষ্টা করছে। পাখির এ ‘বেয়াদবি’ দেখে ক্ষিপ্ত কোতোয়াল ডেকে আনল কামারকে। এবার পাখির জন্য তৈরি হলো শিকল, কাটা পড়ল ডানা। পণ্ডিতেরাও এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি নিয়ে শিক্ষা দিতে উদ্যত হলো। অবশেষে পাখিটা মারা গেল।
শিক্ষার স্বাভাবিক পথকে রুদ্ধ করে বাড়াবাড়ি রকমের আয়োজন ও জবরদস্তিটাই তোতা-কাহিনিতে করুণরূপে ফুটে উঠেছে। এ গল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অপশিক্ষার প্রতিফলকে পাখির মৃত্যুর রূপকে তুলে ধরেছেন।
শব্দার্থ ও টীকা
শাস্ত্র — বিশেষ বিদ্যা বা গ্রন্থ।
অবিদ্যা — অজ্ঞতা।
দক্ষিণা — পারিশ্রমিক, প্রণামী।
স্যাকরা — স্বর্ণকার।
Printed page 5
| শব্দ | অর্থ | শব্দ | অর্থ |
|---|---|---|---|
| হদ্দমুদ্দ | – চেষ্টার শেষ পর্যন্ত, যতদূর সম্ভব। | স্বয়ং | – নিজ। |
| নস্য | – তামাকের গুঁড়া। | অমাত্য | – মন্ত্রী। |
| তলব | – ডাকা। | তুরি | – বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, রণশিঙ্গা, বিউগল। |
| পুথি | – পুস্তক, হাতে লেখা বই। | ভেরি | – বাদ্যযন্ত্রবিশেষ, ঢাক। |
| নকল | – অনুলিপি। | দেউড়ি | – সদর দরজা। |
| পর্বতপ্রমাণ | – পাহাড়ের সমান। | জগঝম্প | – জয়ঢাক, প্রাচীন রণবাদ্য বিশেষ। |
| পারিতোষিক | – পুরস্কার, পারিশ্রমিক। | তদারকনবিশ | – তত্ত্বাবধানকারী। |
| খবরদারি | – তত্ত্বাবধান করা। | ভদ্র-দস্তুর মতো | – শিষ্ট প্রথা অনুযায়ী। |
| পালিশ | – চকচকে করা। | রোমাঞ্চ | – শিহরণ। |
| তনখা | – টাকা, মুদ্রা। | সড়কি | – বর্শা, বল্লম। |
| খুড়তুতো | – চাচাতো, কাকাতো। | কোতোয়াল | – প্রহরী, নগর-রক্ষক। |
| মাসতুতো | – মাসি বা খালার সন্তান। | হাপর | – চুল্লিতে বাতাস দেওয়ার জন্য নলযুক্ত থলি। |
| কোঠা | – বালাখানা-পাকা ঘর, প্রাসাদ। | ঠাহর | – টের পাওয়া, অনুভব করা। |
| নিন্দুক | – নিন্দা করে যে, গল্পে সত্যবাদী অর্থে। | কিশলয় | – গাছের কচি পাতা, নতুন পাতা। |
| তদারক | – তত্ত্বাবধান, খবরদারি। | মুকুলিত | – যা আধফুটন্ত বা যা কুঁড়িতে পরিণত হয়েছে। |
Loading the rest of the chapter…
Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.
Trusted resources
Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.