পাঠ ১: তড়িৎ বিভব এবং তড়িৎ প্রবাহ (পৃষ্ঠা ৮৯–৯০)
১. তড়িৎ বিভব (Electric Potential)
দুটি ভিন্ন ধাতব বস্তুকে পরিবাহী তার দ্বারা সংযুক্ত করলে তাদের মধ্যে ইলেকট্রন বা আধান প্রবাহিত হবে কি না, এবং প্রবাহ কোন দিক থেকে কোন দিকে ঘটবে, তা বস্তু দুটির আধানের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে বস্তু দুটির একটি বিশেষ বৈদ্যুতিক অবস্থার ওপর। এই অবস্থাকে তড়িৎ বিভব বলে।
তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে যেমন তাপ এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে প্রবাহিত হয়, কিংবা পানির উচ্চতার পার্থক্যের কারণে যেমন পানি উচ্চ তল থেকে নিম্ন তলে প্রবাহিত হয়, ঠিক তেমনই বিভবের পার্থক্যের কারণে পরিবাহীতে আধান প্রবাহিত হয়।
সংজ্ঞা — তড়িৎ বিভব (Electric Potential): অসীম দূরত্ব থেকে একটি একক ধনাত্মক আধান বা চার্জকে সমবেগে গতিশীল করে কোনো আধানযুক্ত বা চার্জিত বস্তুর তড়িৎ ক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে যে পরিমাণ কাজ সম্পন্ন করতে হয়, তাকে ঐ বিন্দুর তড়িৎ বিভব বলে।
গাণিতিকভাবে, অসীম দূরত্ব থেকে Q পরিমাণ ধনাত্মক আধানকে তড়িৎ ক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে যদি W পরিমাণ কাজ করতে হয়, তবে ঐ বিন্দুর তড়িৎ বিভব V হবে:
V=QW
তড়িৎ বিভবের আন্তর্জাতিক একক হলো ভোল্ট (Volt), যাকে V প্রতীক দ্বারা প্রকাশ করা হয় (1 V=1 J/C)।
২. তড়িৎ বিভব পার্থক্য (Potential Difference)
একটি পরিবাহী তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার জন্য তার দুই প্রান্তের মধ্যে বিভবের ব্যবধান থাকা আবশ্যক।
সংজ্ঞা — তড়িৎ বিভব পার্থক্য (Potential Difference): প্রতি একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎ ক্ষেত্রের এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে সমবেগে স্থানান্তর করতে সম্পন্ন কাজের পরিমাণকে ঐ বিন্দু দুইটির তড়িৎ বিভব পার্থক্য বলে।
যদি A ও B বিন্দুর বিভব যথাক্রমে VA ও VB হয় এবং VA>VB হয়, তবে বিন্দুদ্বয়ের বিভব পার্থক্য:
V=VA−VB
Q পরিমাণ আধানকে B বিন্দু থেকে A বিন্দুতে আনতে কৃতকাজ W হলে:
V=QW⟹W=V×Q
Important
বিভব পার্থক্যের তাৎপর্য: দুটি ধাতব বস্তুর মধ্যে যতক্ষণ পর্যন্ত বিভব পার্থক্য বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের মধ্যে ইলেকট্রনের প্রবাহ বা তড়িৎ প্রবাহ চলতে থাকে। যদি পরিবাহী তারের দুই প্রান্তের বিভব একই হয়ে যায় (VA=VB), তবে বিভব পার্থক্য শূন্য (V=0) হয়ে যাবে এবং সাথে সাথে তড়িৎ প্রবাহ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। কোনো তড়িৎ কোষ বা ব্যাটারির মূল কাজ হলো রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তনীর দুই প্রান্তে একটি নিরবচ্ছিন্ন বিভব পার্থক্য বজায় রাখা।
৩. তড়িৎ প্রবাহ (Electric Current)
পরিবাহীর মধ্য দিয়ে আধানের সামগ্রিক স্থানান্তরই হলো তড়িৎ প্রবাহ।
সংজ্ঞা — তড়িৎ প্রবাহ (Electric Current): কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তাকে তড়িৎ প্রবাহ বলে।
যদি কোনো পরিবাহীর প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে t সময়ে Q পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তবে পরিবাহীর তড়িৎ প্রবাহ I হবে:
I=tQ
- তড়িৎ প্রবাহের একক: তড়িৎ প্রবাহের আন্তর্জাতিক একক হলো অ্যাম্পিয়ার (Ampere), একে ইংরেজি বর্ণ A দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
- ১ অ্যাম্পিয়ারের সংজ্ঞা: কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে (1 s) যদি এক কুলম্ব (1 C) আধান প্রবাহিত হয়, তবে ঐ পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহকে ১ অ্যাম্পিয়ার (1 A) বলে।
1 A=1 s1 C=1 C⋅s−1
ছোট মানের তড়িৎ প্রবাহ পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত অন্যান্য একক:
- মিলিঅ্যাম্পিয়ার (mA): 1 mA=10−3 A=10001 A
- মাইক্রোঅ্যাম্পিয়ার (μA): 1μA=10−6 A=10000001 A
৪. প্রচলিত তড়িৎ প্রবাহ বনাম ইলেকট্রন প্রবাহের দিক
তড়িৎ প্রবাহের আবিষ্কারের প্রাথমিক যুগে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে, ধনাত্মক আধান উচ্চ বিভব থেকে নিম্ন বিভবের দিকে প্রবাহিত হয়। এই ঐতিহাসিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে বিদ্যুৎ প্রবাহের যে দিক নির্ধারণ করা হয়েছে, তাকে প্রচলিত বিদ্যুৎ প্রবাহের দিক (Conventional Current) বলা হয়।
পরবর্তীতে আধুনিক ইলেকট্রন তত্ত্ব আবিষ্কৃত হওয়ার পর প্রমাণিত হয় যে, ধাতব পরিবাহীতে প্রকৃতপক্ষে ধনাত্মক আধান চলাচল করতে পারে না; বরং পরমাণু থেকে মুক্ত ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রনসমূহ নিম্ন বিভব (বা ঋণাত্মক প্রান্ত) থেকে উচ্চ বিভবের (বা ধনাত্মক প্রান্ত) দিকে ধাবিত হয়।