Skip to content

Bangla Sahapath chapter 1: Novel Introduction

ভূমিকা

  • Bangla Sahapath
  • Textbook pages 1-10
  • 1 source
  • 31,188 characters of context

Textbook (verbatim transcription): Novel Introduction

Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.

Contents5

Printed page 1

ভূমিকা

ক. উপন্যাস কী?

‘উপন্যাস’ সাহিত্যের একটি সংজ্ঞা বা পরিভাষা। সাহিত্যের অনেকগুলো রূপ। তার মধ্যে কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও গল্প – এ পাঁচটি প্রধান। জনপ্রিয়তার দিক থেকে এবং জীবনের বৃহত্তর পটভূমিকে কার্যকরভাবে উপস্থাপনার সক্ষমতায় উপন্যাসকে অনেকে আধুনিক যুগের সবচেয়ে সফল সাহিত্যরূপ বলে মনে করেন।

উপন্যাসে কাহিনি থাকে। কাহিনি ঘটনার সমষ্টি। নির্দিষ্ট স্থান ও কালের মিলনবিন্দুতে এক-একটি ঘটনা ঘটে। এ ধরনের অনেকগুলো ঘটনার সমবায়ে কাহিনি গড়ে ওঠে। তবে কাহিনিমাত্রই উপন্যাস নয়। উপন্যাসে কাহিনিকে বিভিন্নভাবে সাজানো হয়। পরের ঘটনা আগে আসে, আগেরটা পরে। বিভিন্ন উপকাহিনি বা সমান্তরাল কাহিনি যুক্ত হয়। কাহিনির এ বিন্যাস বা সজ্জাকে বলা হয় প্লট। কাহিনিতে যখন একের পর এক ঘটনা ঘটে, তখন আমরা একটি ঘটনাকে আরেকটি ঘটনার সাপেক্ষে পাঠ করি। আমাদের মনে এ উপলব্ধি হয় যে, একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনার সাথে কার্যকারণসূত্রে যুক্ত। অর্থাৎ, একটির কারণেই ফল হিসেবে অন্য একটি ঘটনা ঘটছে। এ কথা বিবেচনায় রাখলে কাহিনিসজ্জা বদলে ফেলার তাৎপর্য উপলব্ধি করা যাবে। যদি লেখক তুলনামূলক পরে সংঘটিত একটি ঘটনা আগে বর্ণনা করেন, তাহলে ঘটনাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক যাবে বদলে। সেক্ষেত্রে তৈরি হবে ভিন্ন ধরনের উপলব্ধি। কাহিনিবিন্যাসের এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করে ঔপন্যাসিক কোনো ঘটনা বা মুহূর্তকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন। এর মধ্য দিয়ে পাঠকের মনের প্রতিক্রিয়াকে বিশেষভাবে পরিচালিত করেন। এ কারণেই উপন্যাসে কাহিনির তুলনায় পটকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ঘটনার অবলম্বন চরিত্র। সাহিত্য মানুষের জীবনেরই বিচিত্র প্রকাশ। নিখিল মানবসমাজের অভিজ্ঞতা ও বৃহত্তর জীবনসত্য উন্মোচিত হয় সাহিত্যে। কিন্তু তার প্রধান অবলম্বন ব্যক্তি। ব্যক্তি-মানুষের সূত্র ধরেই সাধারণভাবে সমষ্টির কথা উঠে আসে। উপন্যাসের ক্ষেত্রে কথাটা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। এখানে সমগ্র কাঠামোর মধ্যে ক্রিয়াশীল ব্যক্তি-মানুষের ছবি অঙ্কিত হয়। ব্যক্তিকে অবলম্বন করেই ঘটনা সংঘটিত হয়। আবার ঘটনার মধ্য দিয়ে বা ঘটনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তির রূপান্তর ঘটে। ফলে ব্যক্তির মধ্যে মানুষের অন্তর্নিহিত স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যের সূক্ষ্ম দিকগুলো প্রকাশিত হয়। উপন্যাসে সাধারণভাবে এ ব্যক্তিই ‘চরিত্র’ হিসেবে অভিহিত হয়।

তবে চরিত্র কথাটার অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। একজন মানুষকে আমরা কতগুলো বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিহ্নিত করি। আমরা ব্যক্তির মূল্যায়ন করি, এবং তার কোনো বৈশিষ্ট্য মানুষের বৃহত্তর ভালো-মন্দের ধারণার সাথে কীভাবে সম্পৃক্ত, তা বিবেচনা করি। উপন্যাসে ব্যক্তি কিন্তু অনেক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। উপন্যাসের ব্যক্তির মধ্য দিয়ে আমাদের বৃহত্তর মানবসমাজের বৈশিষ্ট্য বা মানুষের গভীরতর প্রকৃতির বোধ জন্মে। এদিক থেকে একজন লেখক মানুষের কোন স্বভাব বা বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিয়ে চরিত্র তৈরি করছেন, তা বিশেষভাবে বিবেচনার বিষয় হয়ে ওঠে। যেমন, কোনো মানুষ হয়ত কোনো আদর্শের প্রতি খুবই অনুগত, কেউ হয়ত ভীষণ পারিবারিক, অন্য কেউ খুব বস্তুবাদী কিংবা প্রবৃত্তিপরায়ণ। একজন লেখক এ ধরনের কোন বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁর চরিত্র সৃজন করেন, তার ভিত্তিতে আমরা লেখকের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারি। বিপরীত দিক থেকে বলা যায়, লেখক তাঁর জীবনদৃষ্টি অনুযায়ীই আসলে চরিত্র সৃষ্টি করেন। কাজেই চরিত্র কেবল ঘটনার অবলম্বন নয়; কেবল উপন্যাসের একটি উপকরণ নয়; লেখকের জীবনদৃষ্টিরও যথার্থ বাহন।

শিল্পকলা বা আর্টের যে কোনো শাখাতেই জীবন সম্পর্কে শিল্পীর মূল্যায়ন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ ঘটে। বস্তুত, প্রধানত এ নিরিখেই কাউকে আমরা বড় শিল্পী বলে থাকি। উপন্যাসও এর ব্যতিক্রম নয়। ঔপন্যাসিক কাহিনি বুননের জন্য যেসব ঘটনার সন্নিবেশ ঘটান, যেভাবে চরিত্র সাজিয়ে তোলেন, কিংবা ঘটনাপরম্পরার মধ্য দিয়ে যে পরিণতিকে পৌঁছান, তার ভিতর দিয়ে লেখকের জীবনদৃষ্টির প্রকাশ ঘটে। অন্যভাবে বলা যায়, লেখকের জীবনদৃষ্টির ভিত্তিতেই আসলে কাহিনি, চরিত্র বা পরিণতি গড়ে ওঠে। শুধু তাই নয়। উপন্যাসের ভাষা ও অলঙ্কারের ব্যবহার কেমন হবে, কোন ভঙ্গি বা স্বরে লেখক একটি ছোট ঘটনা বা সংলাপ রচনা করবেন,

Printed page 2

কিংবা ভালো-মন্দের বোধগুলো তিনি কীভাবে নির্ণয় করবেন, তার সবকিছুই নির্ধারিত হয় ওই জীবনদৃষ্টির নিরিখেই। কাজেই বিশিষ্ট জীবনবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসের অনিবার্য অঙ্গ।

উপরের আলোচনার প্রেক্ষাপটে এবার আমরা উপন্যাসের সংজ্ঞায়ন করতে পারি। সংজ্ঞায়ন বলতে বোঝায় কোনো কিছুকে চিহ্নিত করা। এর দুটি দিক। একদিকে সংজ্ঞায়নে জিনিসটি কী তা বলা হয়, অন্যদিকে কী নয় তাও বলা থাকে। যেমন আমরা যদি বলি, উপন্যাস সাহিত্যের একটা রূপ, তাহলে একই সাথে বলা হল যে, উপন্যাস সাহিত্যের বাইরের কিছু নয়। এখন সাহিত্যেরও নানা রূপভেদ আছে। কাজেই উপন্যাসের সংজ্ঞায়ন করতে গেলে অন্য রূপগুলোর সাথে এর ফারাক কোথায়, তাও স্পষ্ট করতে হবে। কবিতার সাথে অন্য সাহিত্যরূপগুলোর প্রধান পার্থক্য শব্দের অর্থ-নির্ণয়ের পদ্ধতিতে – কবিতায় সাধারণভাবে প্রচলিত অর্থের বিচ্যুতি ঘটে এবং নতুন অর্থ তৈরি হয়। তাছাড়া সাধারণ ভাষার সাথে কাব্যিক ভাষার সুর ও স্বরগত পার্থক্যও ঘটে। উপন্যাসে যেখানে ঘটনা বর্ণনা করা হয়, নাটকে সেখানে ঘটনা ক্রিয়ামূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়। ছোটগল্পের সাথে উপন্যাসের বেশ মিল আছে। তবে প্রধান পার্থক্য এই যে, ছোটগল্পে প্রকাশিত হয় জীবনের কোনো একটি দিক বা কোনো বিশেষ মুহূর্ত, আর উপন্যাস প্রকাশ করতে চায় জীবনের সামগ্রিকতা। জীবনদৃষ্টি অবশ্য সবগুলো সাহিত্যরূপেরই সাধারণ উপাদান। এসব বিবেচনায় উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ হতে পারে এরকম: উপন্যাস প্রধানত গদ্যে লেখা বর্ণনামূলক সাহিত্যরূপ, যেখানে ঘটনা ও কাহিনির বিশেষ বিন্যাসের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি-চরিত্র অবলম্বনে জীবনের সামগ্রিকতা প্রকাশের আয়োজন করা হয়, এবং সবকিছু মিলে লেখকের বিশিষ্ট জীবনদৃষ্টির প্রকাশ ঘটে।

উপন্যাসের বিষয় হতে পারে ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজ, রাজনীতি, মনস্তত্ত্ব, ধর্ম – এক কথায় মানুষের সাথে সম্পর্কিত যে কোনো কিছু। বিষয়ের সাথে সাথে ভাষা এবং ভঙ্গিরও যথেষ্ট বদল ঘটে। যেমন, ঐতিহাসিক উপন্যাসে অনেকসময় ইতিহাসের সত্য রক্ষার দায় থাকে; আবার আঞ্চলিক জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাসে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতির প্রতি অনুগত থাকতে হয়। কিন্তু ভাষা-ভঙ্গি যতই আলাদা হোক, উপন্যাসের মূল উপাদান ও স্বভাব অক্ষুণ্ণ থাকে।

উপন্যাসকে প্রায়ই আধুনিক জীবনের সাহিত্যরূপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। মানুষের যাপিত জীবনের সামগ্রিকতা উপস্থাপনের সক্ষমতার জন্য উপন্যাসের এই খ্যাতি। ষোল শতকে ইউরোপে আধুনিকতার সূত্রপাত হওয়ার সময়েই উপন্যাসচর্চা শুরু হয়েছে বলে বেশিরভাগ পণ্ডিত মনে করেন। পুরনো দুনিয়ায় জীবনের সমগ্রতা ধারণের এ কাজ করত মহাকাব্য। মহাকাব্যের বিষয় ছিল সুদূর অতীতের কল্পিত জীবন। বিপরীতে, উপন্যাসের জগৎ ‘বর্তমানময়’। মানুষ যেমন বহুবিচিত্র, তেমনি বিচিত্র তার ভাষা, স্বভাব ও আচরণ। এ বৈচিত্র্যকে পূর্ণ মূল্য দিয়ে জীবনের বিচিত্র রূপ ও সামগ্রিকতা প্রকাশের আশ্চর্য সক্ষমতা আছে উপন্যাসের। এ দিক থেকে বিশ শতকের শিল্পমাধ্যম সিনেমার সাথে উপন্যাসের তুলনা করা চলে। এ জন্যই হয়ত প্রচুর উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ হয়। উনিশ শতকেই উপন্যাস শিল্পরূপগত দিক থেকে সিদ্ধির চূড়ায় পৌঁছেছিল। বিশ শতকে সে ধারা অব্যাহত থেকেছে। বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রেও কথাটা অংশত সত্য। একুশ শতকেও সম্ভবত সিনেমার সমান্তরালে উপন্যাসের এ জয়যাত্রা অব্যাহত থাকবে।

খ. বাংলা উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আগেই বলেছি, উপন্যাস আধুনিক কালের সৃষ্টি। বাংলা সাহিত্যে মাত্র দেড়শত বছর আগে ইংরেজি উপন্যাসের আদলে উপন্যাস রচনার সূত্রপাত ঘটে। তবে অনেকেই এর বীজ খুঁজে পেয়েছেন প্রাচীন সংস্কৃত কাহিনি-কাব্য, পঞ্চতন্ত্র ও বৌদ্ধ জাতকের গল্প, মধ্যযুগের রূপকথা, ময়মনসিংহ গীতিকা, রোমান্টিক কাহিনি-কাব্য, নাথ সাহিত্য,

Printed page 3

মঙ্গলকাব্য, আরব্য উপন্যাস, লোকগাথা প্রভৃতি রচনায়। যাই হোক, আধুনিক কালের পূর্বে বাংলা উপন্যাসের কোনো নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত ঘটলে কলকাতাকে কেন্দ্র করে একদিকে ব্যাপক নগরায়ন, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। ইউরোপীয় শিক্ষার প্রভাবে মানবিকতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, শিক্ষা ও সাময়িক পত্রের প্রসার, সমাজ সচেতনতা ইত্যাদি বৃদ্ধি পায়। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের দ্বারা সমাজ ক্রমশ জটিল হয়ে পড়ে। নতুন কালের মানুষ নতুন সমাজের কথা প্রকাশের গরজ অনুভব করতে থাকে। এরই প্রভাবে উদ্ভব ঘটে উপন্যাসের।

অনেকে মনে করেন, হানা ক্যাথারিন মুলেন্সের (১৮২৬-৬১) লেখা ফুলমনি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২) হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস। কেউ কেউ আবার প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮) -এর মধ্যে উপন্যাসের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছেন। তবে সবাই মেনে নিয়েছেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-৯৪) দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস। বঙ্কিমচন্দ্রই প্রকৃতপক্ষে আধুনিক বাংলা উপন্যাসের স্রষ্টা। উপন্যাসের সমস্ত লক্ষণ তাঁর উপন্যাসে দেখা যাবে। তিনি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন। লিখেছেন সামাজিক উপন্যাস। সমাজের নানা অসংগতি, ব্যক্তির কামনা, বাসনা, বেদনা ও দ্বন্দ্বের কথা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর উপন্যাসে। কাহিনি বর্ণনা, চরিত্রচিত্রণ, ভাষা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তিনি সাফল্য দেখিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস কপালকুণ্ডলা, বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল ইত্যাদি।

বাংলা উপন্যাসের আরেক কীর্তিমান লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। উপন্যাস রচনাতেও তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়। ব্যক্তির মন ও মননের অপূর্ব সমন্বয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাসগুলো রচনা করেছেন। বঙ্কিমের উপন্যাসে আমরা দেখেছি সমাজের চাপে ব্যক্তি আত্মপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে নি। তাঁর চরিত্রগুলো সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে পাওয়া গেল নতুন কালের নারী ও পুরুষকে। মানবিকতার দ্বারা দীক্ষিত হয়ে তারা সামাজিক সংস্কারকে অস্বীকার করছে। নারী-পুরুষের সমানাধিকারের ভিত্তিতে অর্জন করতে চাইছে আত্মপ্রতিষ্ঠা। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে চাইছে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান। কাহিনি নির্মাণ, চরিত্র চিত্রণ, ভাষার নিরীক্ষা, যুগের প্রতিফলন, মনোবিশ্লেষণ ইত্যাদি দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসগুলো উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখা বহুল আলোচিত উপন্যাস চোখের বালি, গোরা, ঘরে বাইরে, চার অধ্যায় ও যোগাযোগ।

রবীন্দ্রনাথের পরে বাঙালির গৃহকাতরতা এবং আবহমান পারিবারিক আবেগের ওপর ভর করে উপন্যাস লিখেছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)। অর্জন করেছিলেন ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস চরিত্রহীন, গৃহদাহ, দেবদাস, দেনা-পাওনা, শ্রীকান্ত ইত্যাদি।

বাংলা উপন্যাসের জগতে এরপর আবির্ভাব ঘটে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের– তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০) এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬)। আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক মাধুর্য পল্লির স্নিগ্ধশান্ত রূপ, অরণ্য, পাহাড় যে এখনো আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, বিভূতিভূষণের লেখা পথের পাঁচালী, অপরাজিতা, আরণ্যক ইত্যাদি উপন্যাস পড়লেই তা বোঝা যায়। তারাশঙ্করের উপন্যাসে পাই অতীতের গৌরব, ঐশ্বর্য হারানো জমিদার আর নিম্নশ্রেণির বিচিত্র পেশার সাধারণ মানুষের কথা। এই মানুষজন আমাদের চিরচেনা বৈষ্ণবী, কবিয়াল, যাত্রাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, বেদে, সাপুড়ে, বাজিকর, ঝুমুর দলের নাচিয়ে ইত্যাদি। উঠতি শিল্পমালিক আর শ্রমিকদের জীবনের ছবিও পাওয়া যাবে তাঁর উপন্যাসে। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস গণদেবতা, পঞ্চগ্রাম, ধাত্রীদেবতা, হাসুলী বাঁকের উপকথা, কবি প্রভৃতি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ঃ (১) মার্কসবাদের পটভূমিতে ধনী-দরিদ্রের দ্বন্দ্ব এবং (২) ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণের আলোকে নর-নারীর জটিল

Printed page 4

সম্পর্কের বিন্যাস। ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা জর্জরিত মানুষের জীবনের ছবি তাঁর উপন্যাসে উজ্জ্বল। সেই সঙ্গে পাওয়া যাবে গ্রামীণ বাস্তবতার চিত্র। দিবারাত্রির কাব্য, পদ্মানদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিহ্ন, শহরতলী প্রভৃতি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। বাংলা উপন্যাস আরও যাঁরা লিখে খ্যাতিমান হয়েছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেনঃ জগদীশ গুপ্ত, সতীনাথ ভাদুড়ী, কমলকুমার মজুমদার, দেবেশ রায়, অমিয়ভূষণ মজুমদার, মহাশ্বেতা দেবী প্রমুখ।

Loading the rest of the chapter…

Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.

Trusted resources

Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.