Bangla Sahapath chapter 2: 1971
১৯৭১
- Bangla Sahapath
- Textbook pages 11-56
- 1 source
- 89,633 characters of context
Textbook (verbatim transcription): 1971
Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.
Printed page 11
১৯৭১
হুমায়ূন আহমেদ
মীর আলি চোখে দেখে না।
আগে আবছা আবছা দেখত। দুপুরের রোদের দিকে তাকালে হলুদ কিছু ভাসত চোখে। গত দুবছর ধরে তাও ভাসছে না। চারদিকে সীমাহীন অন্ধকার। তার বয়স প্রায় সত্তর। এই বয়সে চোখ-কান নষ্ট হতে শুরু করে। পৃথিবী শব্দ ও বর্ণহীন হতে থাকে। কিন্তু তার কান এখনো ভালো। বেশ ভালো। ছোট নাতনিটি যতবার কেঁদে ওঠে ততবারই সে বিরক্ত মুখে বলে, ‘চুপ, শব্দ করিস না।’
মীর আলি আজকাল শব্দ সহ্য করতে পারে না। মাথার মাঝখানে কোথায় যেন ঝনঝন করে। চোখে দেখতে পেলেও বোধহয় এরকম হতো—আলো সহ্য হতো না। বুড়ো হওয়ার অনেক যন্ত্রণা! সবচেয়ে বড়ো যন্ত্রণা রাতদুপুরে বাইরে যেতে হয়। একা একা যাওয়ার উপায় নেই। তাকে তলপেটের প্রবল চাপ নিয়ে মিহি সুরে ডাকতে হয়, ‘বদি, ও বদি! বদিউজ্জামান!’
বদিউজ্জামান তার বড় ছেলে। মধুবন বাজারে তার একটা মনোহারি দোকান আছে। রোজ সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে সাত মাইল হেঁটে সে বাড়ি আসে। পরিশ্রমের ফলে তার ঘুম হয় গাঢ়। সে সাড়া দেয় না। মীর আলি ডেকেই চলে, ‘বদি, ও বদি! বদিউজ্জামান!’ জবাব দেয় তার ছেলের বউ অনুফা। অনুফার গলার স্বর অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। সেই তীক্ষ্ণ স্বর কানে এলেই মীর আলির মাথা ধরে। তবু সে মিষ্টি সুরে বলে, ‘ও বৌ, এট্টু বাইরে যাওন দরকার। বদিরে উঠাও।’
অনুফা তার স্বামীকে জাগায় না। নিজেই কুপি হাতে এগিয়ে এসে শ্বশুরের হাত ধরে। বড় লজ্জা লাগে মীর আলির। কিন্তু উপায় কী? বুড়ো হওয়ার অনেক যন্ত্রণা। অনেক কষ্ট। মীর আলি নরম স্বরে বলে, ‘চাঁদনি রাইত নাকি, ও বৌ?’
‘জি না।’
‘চউখে ফসর ফসর লাগে। মনে হয় চাঁদনি।’
‘না, চাঁদনি না। এইখানে বসেন। এই নেন বদনা।’
অনুফা দূরে সরে যায়। মীর আলি ভারমুক্ত হয়। অন্যরকম একটা আনন্দ হয় তার। ইচ্ছা করে কিছুক্ষণ বসে থাকতে। অনুফা ডাকে, ‘আব্বাজান, হইছে?’
‘হুঁ।’
‘উঠেন। বইসা আছেন কেন?’
‘ফজর ওয়াক্তের দেরি কত?’
‘দেরি আছে। আব্বাজান উঠেন।’
মীর আলি অনুফার সাহায্য ছাড়াই উঠানে ফিরে আসে। দক্ষিণ দিক থেকে সুন্দর বাতাস দিচ্ছে। রাতের দ্বিতীয় প্রহর শেষ হয়েছে বোধহয়। একটা-দুটা করে শিয়াল ডাকতে শুরু করেছে।
মীর আলি হৃষ্ট গলায় বলে, ‘রাইত বেশি বাকি নাই।’
অনুফা জবাব দেয় না, হাই তোলে।
‘একটা জলচৌকি দেও, উঠানে বইয়া থাকি।’
‘দুপুর-রাইতে উঠানে বইবেন কী? যান, ঘুমাইতে যান।’
মীর আলি বাধ্য ছেলের মতো বিছানায় শুয়ে পড়ে। একবার ঘুম ভাঙলে বাকি রাতটা তার জেগে কাটাতে হয়। সে বিছানায় বসে ঘরের স্পষ্ট-অস্পষ্ট সব শব্দ অত্যন্ত মন দিয়ে শোনে।
Printed page 12
বদি খুকখুক করে কাশছে। টিনের চালে ঝটপট শব্দ। কীসের শব্দ? বানর? চৌকির নিচে সবগুলো হাঁস একসঙ্গে প্যাঁকপ্যাঁক করল। বাড়ির পাশে শেয়াল হাঁটাহাঁটি করছে বোধহয়। পরীবানু কেঁদে উঠল। দুধ খেতে চায়। অনুফা দুধ দেবে না। চাপা গলায় মেয়েকে শাসাচ্ছে। বদি আবার কাশছে। ঠান্ডা লেগেছে নাকি? পরশু দিন ভিজে বাড়ি ফিরেছে। জ্বর তো হবেই। বদির কথা শোনা যাচ্ছে। ফিসফিস করে কী যেন বলছে।
কী বলছে? এত ফিসফিসানি কেন? মীর আলি কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করে। কাক ডাকল। সকাল হচ্ছে নাকি? মীর আলি ভোরের প্রতীক্ষা করে, তার তলপেট আবার ভারী হয়ে ওঠে।
‘বদি, ও বদি! বদিউজ্জামান!’
‘কী?’
‘এট্টু বাইরে যাওন দরকার।’
বদি সাড়াশব্দ করে না। পরীবানু তারস্বরে কাঁদে। দুধ খেতে চায়।
‘ও বদি, বদিউজ্জামান।’
‘আসি আসি।’
‘তাড়াতাড়ি কর।’
‘আরে দুত্তোরি! এক রাইতে কয়বার বাইরে যাইবেন?’
বদি প্রচণ্ড একটা চড় বসায় পরীবানুর গালে। বিরক্ত গলায় বলে, ‘টর্চটা দাও অনুফা।’
অনুফা টর্চ খুঁজে পায় কিন্তু অন্ধকারে ব্যাটারি খুঁজে পায় না।
মীর আলি অপেক্ষা করতে করতে একসময় অবাক হয়ে বুঝতে পারে তার প্রস্রাব হয়ে গেছে। বিছানার একটা অংশ ভেজা। সে অত্যন্ত বিচলিত বোধ করে। এরকম তার আগে কখনো হয়নি।
‘আসেন যাই। যত ঝামেলা! দেখি হাতটা বাড়ান।’
বদি তার হাত ধরে। মীর আলি খুব দুর্বল ও অসহায় বোধ করে।
‘এখন থাইক্যা ঘরের মইধ্যে একটা পাতিলে পেশাব করবেন। ঝামেলা ভালো লাগে না।’
‘আইচ্ছা।’
‘আর পানি কম খাইবেন। বুঝলেন?’
‘আইচ্ছা।’
বদি তাকে উঠোনের এক মাথায় বসিয়ে দেয়। মীর আলি প্রস্রাব করার চেষ্টা করে। প্রস্রাব হয় না, ভোঁতা একটা যন্ত্রণা হয়।
বদি হাঁক দেয়, ‘কী হইছে? রাইত শেষ করবেন নাকি?’
আর ঠিক তখন মীর আলির সামনে দিয়ে সরসর শব্দ করে একটা কিছু চলে যায়। কী এটা! সাপ? মীর আলির দেখতে ইচ্ছা করে।
‘আরে! বিষয় কী, ঘুমাইয়া পড়ছেন নাকি?’
‘নাহ! একটা সাপ গেল সামনে দিয়া।’
‘আরে দুত্তোরি সাপ! উঠেন দেখি।’
‘মনে হয় জাতি সাপ। বিরাট লম্বা মনে হইল।’
‘আরে ধ্যুৎ! উইঠা আসেন।’
Printed page 13
মীর আলি উঠে দাঁড়ায়। আর ঠিক তখন আজান হয়। মীর আলি হাসিমুখে বলে, ‘আজান দিছে। ও বদি, আজান দিছে।’
‘দিছে দেউখ। ঘরে চলেন।’
‘ওখন আর ঘরে গিয়া কী কাম? গোসলের পানি দে। গোসল সাইরা নামাজটা পড়ি।’
বদি বিরক্ত গলায় বলে, ‘অজু কইরা নামাজ পড়েন। গোসল ক্যান?’
‘শইলডা পাক না। নাপাক শইল।’
‘আপনে থাকেন বইয়া, অনুফারে পাঠাই। যত ঝামেলা!’
বদিউজ্জামান তার বাবাকে একটা জলচৌকির ওপর বসিয়ে ভেতরে চলে যায়। আর আসে না। পরী বানু ঘ্যানঘ্যান করে কাঁদে। মীর আলি বসে থাকে চুপচাপ।
তার কিছুক্ষণ পর পঞ্চাশজন সৈন্যের ছোট একটা দল গ্রামে এসে ঢোকে। মার্চ-টার্চ না, এলোমেলোভাবে চলা। তাদের পায়ের বুটে কোনো শব্দ হয় না। তারা যায় মীর আলির বাড়ির সামনে দিয়ে এবং তাদের একজন মীর আলির চোখে পাঁচ ব্যাটারি টর্চের আলো ফেলে। মীর আলি কিছু বুঝতে পারে না। শুধু উঠোনে বসে থাকা কুকুরটা তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। মীর আলি ভীত স্বরে ডাকে, ‘বদি, ও বদি! বদিউজ্জামান!’
কুকুরটি একসময় আর ডাকে না। দলটির পেছনে পেছনে কিছুদূর গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। তারপর দ্রুত ফিরে আসে মীর আলির কাছে। মীর আলি উঁচু গলায় ডাকে, ‘ও বদি! ও বদিউজ্জামান!’
‘কী হইছে? বেহুদা চিল্লান কেন?’
‘বাড়ির সামনে দিয়া কারা যেন গেল।’
‘আরে দুত্তোরি! যত ফালতু ঝামেলা। চুপ কইরা বইয়া থাকেন।’
মীর আলি চুপ করে যায়। চুপ করে থাকে কুকুরটিও। নিম্নশ্রেণির প্রাণীরা অনেক কিছু বুঝতে পারে। তারা টের পায়। গ্রামের নাম নীলগঞ্জ। পহেলা মে। উনিশশো একাত্তর। ক্ষুদ্র সৈন্যবাহিনীর অধিনায়ক একজন মেজর–এজাজ আহমেদ। কাকুল মিলিটারি একাডেমির একজন কৃতী ক্যাডেট। বাড়ি পেশোয়ারের এক অখ্যাত গ্রামে। তার গাঁয়ের নাম রেশোবা।
২
ময়মনসিংহ-ভৈরব লাইনের একটি স্টেশন নান্দাইল রোড।
ছোট্ট গরিব স্টেশন। মেল ট্রেন থামে না। লোকাল ট্রেন মিনিটখানেক থেকেই ফ্ল্যাগ উড়িয়ে পালিয়ে যায়। স্টেশনের বাইরে ইট-বিছানো রাস্তায় চার-পাঁচটা রিকশা ঠুন ঠুন করে ঘণ্টা বাজিয়ে যাত্রী খোঁজে। সুরেলা গলা শোনা যায়, ‘রুয়াইল বাজার যাওনের কেউ আছুইন। রুয়াইল বা-জা-র?’
রুয়াইল বাজার এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বাজার। নান্দাইল রোড থেকে সোজা উত্তরে দশ মাইল। খুব খারাপ রাস্তা। বর্ষাকালে রিকশা চলে না। হেঁটে যেতে হয়। এঁটেল মাটিতে পা দেবে যায়, থিক থিক ঘন কাদা। নান্দাইল রোড থেকে রুয়াইল বাজার আসতে বেলা পুইয়ে যায়।
বাজারটি অন্য সব গ্রাম্য বাজারের মতো। তবে স্থানীয় লোকদের খুব অহংকার একে নিয়ে। কী নেই এখানে? ধানচালের আড়ত আছে। পাটের গুদাম আছে। ধান ভাঙানোর কল আছে। চায়ের দোকান আছে। এমনকি রেডিও সারাবার একজন কারিগর পর্যন্ত আছে। গ্রামের বাজারে এরচেয়ে বেশি কী দরকার?
Printed page 14
রুয়াইল বাজারকে পেছনে ফেলে আরও মাইল ত্রিশেক উত্তরে মধুবন বাজার। যাতায়াতের একমাত্র ব্যবস্থা গরুর গাড়ি। তাও শীতকালে। বর্ষায় হাঁটা ছাড়া অন্য উপায় নেই। উজান দেশ। নদীনালা নেই যে নৌকা চলবে। মধুবন বাজার পেছনে ফেলে পুবদিকে সাত-আট মাইল গেলে ঘন জঙ্গল। স্থানীয় নাম মধুবনের জঙ্গলা মাঠ। কাঁটাঝোপ, বাঁশ আর জারুলের মিশ্র বন। বেশ কিছু গাব ও ডেফলজাতীয় অন্ত্যজ শ্রেণির গাছও আছে। জঙ্গলা মাঠের এক অংশ বেশ নিচু। সেখানে মোরতা গাছের ঘন অরণ্য। শীতকালে সেইসব মোরতা কেটে এনে পাটি বোনা হয়। পাকা লটকনের খোঁজে বালক-বালিকারা বনের ভেতর ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু বর্ষাকালে কেউ যায় না সেদিকে। খুব সাপের উপদ্রব। বনে ঢুকে প্রতি বছরই দু-একটা গরু-ছাগল সাপের হাতে মারা পড়ে।
জঙ্গলা মাঠের পেছনে নীলগঞ্জ গ্রাম। দরিদ্র, শ্রীহীন, ত্রিশ-চল্লিশ ঘরের একটি বিচ্ছিন্ন জনপদ। বিস্তীর্ণ জলাভূমি গ্রামটিকে কাস্তের মতো দুদিকে ঘিরে আছে। সেখানে শীতকালে প্রচুর পাখি আসে। পাখি-মারা জাল নিয়ে পাখি ধরে বাজারে বিক্রি করে পাখি-মারারা। চাষবাস যা হয় দক্ষিণের মাঠে। জমি উর্বর নয় কিংবা এরা ভালো চাষি নয়। ফসল ভালো হয় না। তবে শীতকালে এরা প্রচুর রবিশস্য করে। বর্ষার আগে-আগে করে তরমুজ ও বাঙ্গি। দক্ষিণের জমিতে কোনোরকম যত্ন ছাড়াই এ দুটি ফল প্রচুর জন্মায়। গ্রামের অধিকাংশ ঘরেই খড়ের ছাউনি। সম্প্রতি কয়েকটি টিনের ঘর হয়েছে। বদিউজ্জামানের ঘরটি টিনের। তার হাতে এখন কিছু পয়সাকড়ি হয়েছে। টিনের ঘর বানানো ছাড়াও সে একটা সাইকেল কিনেছে। চালানো শিখে উঠেনি বলে এখনো সে হেঁটেই মধুবন বাজারে যায়। সপ্তাহে একবার নতুন সাইকেলটি ঝাড়পোঁছ করে। গ্রামের একমাত্র পাকা দালানটি প্রকাণ্ড। দুবিঘা জমির ওপর একটা হুলুস্থুল ব্যাপার। সুসং দুর্গাপুরের মহারাজার নায়েব চন্দ্রকান্ত সেন মশাই এ বাড়ি বানিয়ে গৃহপ্রবেশের দিন সর্পাঘাতে মারা পড়েন।
চন্দ্রকান্ত সেন প্রচুর ধনসম্পদ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেসবের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। সবার ধারণা, সোনাদানা পিতলের কলসিতে ভরে তিনি যক্ষ করে গেছেন। তাঁর উত্তরাধিকারীরা পিতলের কলসির খোঁজে প্রচুর খোঁড়াখুঁড়ি করেছে। কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। চন্দ্রকান্ত সেন মশাইয়ের বর্তমান একমাত্র উত্তরাধিকারী নীলু সেন প্রকাণ্ড দালানটিতে থাকেন। তার বয়স প্রায় পঞ্চাশ। দেখায় তার চেয়েও বেশি। নীলু সেনকে গ্রামে যথেষ্ট খাতির করা হয়। যাবতীয় সালিশিতে তিনি থাকেন। বিয়েশাদির কোনো কথাবার্তা তাঁকে ছাড়া কখনো হয় না। লোকটি অত্যন্ত মিষ্টভাষী। এ গ্রামে সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তি হচ্ছে জয়নাল মিয়া। প্রচুর বিষয়সম্পত্তির মালিক। মধুবন বাজারে তার দুটি ঘরও আছে। লোকটি মেরুদণ্ডহীন। সবার মন রেখে কথা বলার চেষ্টা করে। গ্রাম্য সালিশিতে সবার কথাই সমর্থন করে বিচার-সমস্যা জটিল করে তোলে। তবু সবাই তাকে মোটামুটি সহ্য করে। সম্পদশালীরা এই সুবিধাটি সব জায়গাতেই ভোগ করে।
দুজন বিদেশি লোক আছেন নীলগঞ্জে। একজন নীলগঞ্জ মসজিদের ইমাম সাহেব। এত জায়গা থাকতে তিনি এই দুর্গম অঞ্চলে ইমামতি করতে কেন এসেছেন সে রহস্যের মীমাংসা হয়নি। তিনি মসজিদেই থাকেন। মাসের পনেরো দিন জয়নাল মিয়ার বাড়িতে খান। বাকি পনেরো দিন পালা করে অন্য ঘরগুলোতে খান। কিছুদিন হলো তিনি বিয়ে করে এই গ্রামে স্থায়ীভাবে থাকবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
প্রস্তাবটিতে কেউ এখনো তেমন উৎসাহ দেখাচ্ছে না। ধানি জমি দিতে পারে জয়নাল মিয়া। সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছে। শুনেও না-শোনার ভান করছে। দ্বিতীয় বিদেশি লোকটি হচ্ছে আজিজ মাস্টার। সে নীলগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। প্রাইমারি স্কুল সরকারি সাহায্যে তিন বছর আগে শুরু হয়। উদ্দেশ্য বোধহয় একটিই–দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌঁছানো। উদ্দেশ্য সফল হয়নি। শিক্ষকরা কেউ বেশিদিন থাকতে পারে না।
Printed page 15
খাতাপত্রে তিনজন শিক্ষক থাকার কথা। এখন আছে একজন–আজিজ মাস্টার। লোকটি রুগ্ণ, নানান রকম অসুখ-বিসুখ। তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে হাঁপানি। শীতকালে এর প্রকোপ হয়। গরমকালটা মোটামুটি ভালোই কেটে যায়। আজিজ মাস্টার একজন কবি। সে গত তিন মাসে চার নম্বরি একটি রুলটানা খাতা কবিতা লিখে ভরিয়ে ফেলেছে। প্রতিটি কবিতা একটি রমণীকে উদ্দেশ্য করে লেখা, যাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়েছে, যেমন–স্বপ্ন-রানী, কেশবতী, অচিন পাখি ইত্যাদি। তার তিনটি কবিতা নেত্রকোনা থেকে প্রকাশিত ‘মাসিক কিষাণ পত্রিকা’য় ছাপা হয়েছে। আজিজ মাস্টারের কাব্যপ্রতিভা সম্পর্কে গ্রামের লোকজন ওয়াকিবহাল। তারা এই কবিকে যথেষ্ট সমীহ করে। সমীহ করার আরেকটি কারণ হলো, আজিজ মাস্টার গ্রামের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ। বিএ পর্যন্ত পড়েছিল। পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। তার আবার পরীক্ষা দেওয়ার কথা।
সে জয়নাল মিয়ার একটি ঘরে থাকে। তার স্ত্রীকে সে ‘ভাবিসাব’ ডাকে কিন্তু তার বড় মেয়েটিকে দেখলেই কেমন যেন বিচলিত বোধ করে। মেয়েটির নাম মালা। মাঝে মাঝে মালা তাকে ভাত বেড়ে দেয়। সে-সময়টা আজিজ মাস্টার বড় অস্বস্তি বোধ করে। সে যখন বলে, ‘মামা, আরেকটু ভাত দেই?’ তখন কোনো কারণ ছাড়াই আজিজ মাস্টারের কান-টান লাল হয়ে যায়। আজিজ মাস্টার কয়েকদিন আগে ‘মালা রানী’ নামের একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেছে। কবিতাটি ‘কিষাণ’ পত্রিকায় পাঠাবে কি না এ নিয়ে সে খুব চিন্তিত। হয়তো পাঠাবে। নীলগঞ্জের যে দিকটায় জলাভূমি, একদল কৈবর্ত থাকে সেদিকে। গ্রামের সঙ্গে তাদের খুব একটা যোগ নেই। মাছ ধরার সিজনে জলমহালে মাছ মারতে যায়। আবার ফিরে আসে। কর্মহীন সময়টাতে চুরি-ডাকাতি করে। নীলগঞ্জের কেউ এদের ঘাঁটায় না।
গত বৎসর কৈবর্তপাড়ায় খুন হলো একটা। নীলগঞ্জের মাতব্বররা এমন ভাব করলেন যেন তাঁরা কিছুই জানেন না। থানা-পুলিশ কিছুই হলো না। যার ছেলে খুন হলো সেই চিত্রা বুড়ি কিছুদিন ছোটাছুটি করল নীলু সেনের কাছে। নীলু সেন শুকনো গলায় বললেন, ‘তোদের ঝামেলা তোরা মিটা। থানাওয়ালার কাছে যা।’ বুড়ি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, ‘থানাওয়ালার কাছে গেলে আমারে দহের মইধ্যে পুইত্তা থুইব কইছে।’ নীলু সেন গম্ভীর হয়ে গেলেন। টেনে টেনে বললেন, ‘এদের ঘাঁটাঘাঁটি করা ঠিক না। রক্তগরম জাত। কী করতে কী করে।’
‘বিচার অইত না?’
নীলু সেন তার জবাব দিতে পারলেন না। অস্পষ্টভাবে বললেন, ‘এখন বাদ দে। পরে দেখি কিছু করা যায় কি না।’ বুড়ি আরও কিছুদিন ছোটাছুটি করল। এবং একদিন দেখা গেল কৈবর্তরা দলবেঁধে জলমহালে মাছ মারতে গিয়েছে। বুড়িকে সঙ্গে নেয়নি। বুড়ি আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করল কিছুদিন। নীলু সেনের দালানের একপ্রান্তে থাকতে লাগল। চরম দুর্দিন। কৈবর্তরা ফিরে এলো তিনমাস পর, কিন্তু বুড়ির জায়গা হলো না। সে এ-বাড়ি ও-বাড়ি ভিক্ষা করে খেতে লাগল। হতদরিদ্র নীলগঞ্জের প্রথম ভিক্ষুক।
সব গ্রামের মতো এই গ্রামে একজন পাগলও আছে। মতি মিয়ার শালা নিজাম। সে বেশির ভাগ সময়ই সুস্থ থাকে। শুধু দু-একদিন মাথা গরম হয়ে যায়। তখন তার গায়ে কোনো কাপড় থাকে না। গ্রামের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত ছোটাছুটি করতে থাকে। দুপুরের রোদ খুব বেড়ে গেলে মধুবন জঙ্গলায় ঢুকে পড়ে। ‘পাগলদের সাপে কাটে না’ প্রবাদটি হয়তো সত্যি। নিজাম বহাল তবিয়েতেই বন থেকে বেরিয়ে আসে। ছোটাছুটি করা এবং বনের ভেতরে বসে থাকা ছাড়া সে অন্য কোনো উপদ্রব করে না। গ্রামের পাগলদের গ্রামবাসীরা খুব স্নেহের চোখে দেখে। তাদের প্রতি অন্য একধরনের মমতা থাকে সবার।
Printed page 16
Loading the rest of the chapter…
Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.
Trusted resources
Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.