Skip to content

Bangladesh and Global Studies chapter 14: Social Change in Bangladesh

বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তন

  • Bangladesh and Global Studies
  • Textbook pages 178-184
  • 1 source
  • 16,339 characters of context

Textbook (verbatim transcription): Social Change in Bangladesh

Verbatim transcription of the printed NCTB textbook pages.

Contents7

Printed page 178

চতুর্দশ অধ্যায়

বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তন

সমাজ পরিবর্তনশীল। বাংলাদেশের সমাজও এ বৈশিষ্ট্যের ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে এদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। শিক্ষা, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের পরিবর্তন এদেশের সমাজ ও অর্থনীতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। ব্যাপক শিল্পায়ন ও নগরায়ণ নারীর ভূমিকায় পরিবর্তন এনে দিয়েছে। সমাজ জীবনের এ পরিবর্তনে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার উদ্ভব ঘটেছে। এ অধ্যায়ে আমরা সামাজিক পরিবর্তনের ধারণা, বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তনের কারণ, গ্রাম ও শহরভেদে এ পরিবর্তনের প্রভাব এবং নারীর ভূমিকার পরিবর্তন সম্পর্কে জানব।

এ অধ্যায় শেষে আমরা–

  • সামাজিক পরিবর্তনের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব;
  • বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তনের উপাদানসমূহ ব্যাখ্যা করতে পারব;
  • বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহুরে সমাজে সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে পারব;
  • বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তনের উপাদান হিসেবে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে পারব;
  • সামাজিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বাংলাদেশে নারীর ভূমিকার পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারব;
  • সামাজিক পরিবর্তনজনিত অবস্থায় নিজেকে খাপ খাওয়াতে সক্ষম হব;
  • সামাজিক পরিবর্তনজনিত বিষয়ে সচেতন হব।

সামাজিক পরিবর্তনের ধারণা

সামাজিক পরিবর্তন বলতে সমাজকাঠামো ও এর কার্যাবলির পরিবর্তনকে বোঝায়। প্রতিটি সমাজের মৌল কাঠামো গড়ে উঠে সে সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং উক্ত ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন পেশার মানুষের সম্পর্কের মাধ্যমে। আবার এই কাঠামোর সাথে গড়ে ওঠে কতকগুলো উপরি কাঠামো; যেমন– আইন-কানুন, রাজনীতি, সংস্কৃতি প্রভৃতি। সুতরাং সমাজের মৌল ও উপরি কাঠামোর পরিবর্তনই সামাজিক পরিবর্তন।

সামাজিক পরিবর্তনের ধারণা সম্পর্কে সমাজবিজ্ঞানী কিংসলে ডেভিস বলেন, 'সামাজিক পরিবর্তন হচ্ছে সামাজিক সংগঠনের মধ্যকার পরিবর্তন'। ম্যাকাইভার বলেন, 'মানবীয় সম্পর্কের পরিবর্তন হচ্ছে সামাজিক পরিবর্তন।' অর্থাৎ সামাজিক পরিবর্তন হলো সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের আচার-আচরণের পরিবর্তন। সমাজের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পরিবর্তন। মোটকথা, সামাজিক পরিবর্তন হচ্ছে কোনো জাতির জীবন ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিবর্তন।

Printed page 179

সামাজিক পরিবর্তন সংঘটিত হয় কখনো মন্থর গতিতে আবার কখনো দ্রুতগতিতে। এই পরিবর্তনের প্রভাব অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ এমনকি সনাতন জীবন ব্যবস্থাকেও গভীরভাবে স্পর্শ করে। সমাজের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড লাভ করে নতুন গতি। উন্মুক্ত হয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখা ও কলাকৌশল। সৃষ্টি হয় নতুন সৃষ্টির উন্মাদনা এবং শুরু হয় নতুন সমাজ গঠনের প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তনের উপাদান এবং এর প্রভাব

বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তন দেশের অর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রভৃতি উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়। সমাজের এ ক্ষেত্রসমূহে পরিবর্তনের মূলে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কতকগুলো উপাদান। নিম্নে এ উপাদানগুলো আলোচনা করা হলো।

১. প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত উপাদান : বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিগত অবস্থান সামাজিক পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। ধীর এবং আকস্মিক ভৌগোলিক পরিবর্তন, জলবায়ু সংক্রান্ত পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রভৃতি বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে এবং সমাজের ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে। এদেশে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, টর্নেডো, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন প্রতিদিনের ঘটনা। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। তখন পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধানের জন্য নতুন পদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এর ফলে মানুষের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে থাকে; যেমন– নদীভাঙন এ দেশের শহরাঞ্চলে বস্তি সৃষ্টির একটি কারণ। বস্তিতে অল্প জায়গায় অনেক মানুষ বসবাস, নাগরিক সুবিধার অভাব ও পুরানো সমাজ পরিবারের সুরক্ষা না থাকাতে নানান সমস্যার জন্ম নিয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি বহু কার্যক্রম গ্রহণ করায় শহুরে সমাজে নানা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে। মানুষ এসব সমস্যা মোকাবিলায় নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করে সামাজের পরিবর্তন সাধন করে।

২. জৈবিক উপাদান : জৈবিক উপাদান সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জন্ম ও মৃত্যুহার, গড় আয়ু, জনসংখ্যার ঘনত্ব, জনসংখ্যার প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার মান নিয়েই জৈবিক উপাদান। মানুষের জৈবিক অবস্থার পরিবর্তন, যেমন– জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস, স্থানান্তর অথবা ঘনত্বের পরিবর্তন সামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রতিরোধে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। জন্ম ও মৃত্যুহার হ্রাস সমাজকাঠামো পরিবর্তন করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে অন্যান্য সুযোগ সুবিধা না বাড়ায় এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিবর্তনের জন্য বেকারত্ব, শিশুশ্রম ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতার মতো নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

কাজ

দলগত : দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রাকৃতিক উপাদানের প্রভাব ও পরিবর্তনসমূহ চিহ্নিত কর।

একক : যে কোনো একটি জৈবিক উপাদান চিহ্নিত কর এবং সমাজে এর প্রভাব বিশ্লেষণ করো।

৩. সাংস্কৃতিক উপাদান : সংস্কৃতি সামাজিক পরিবর্তন সূচনা করে। যে কোনো সমাজের দিকে তাকালেই দেখা যাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, মানুষের মূল্যবোধের পার্থক্য, উদ্দেশ্য ও আদর্শের ভিন্নতা প্রভৃতি। এরই ফলে সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন সংস্কৃতি লালিত প্রতিষ্ঠান। এসব সমাজের মধ্যে নানা রকমের পরিবর্তন সৃষ্টি করে, যেমন– ব্রিটিশ রাজত্বের সময় বাংলার সমাজব্যবস্থার উপরে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব বিশেষভাবে পরিদৃষ্ট হয়। তাছাড়া ভ্রমণকাহিনি পাঠ, বিদেশ ভ্রমণ, অন্যান্য দেশের জনগণের সঙ্গে সাক্ষাৎকার এসবই সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। হজরত মুহম্মদ (সা.), গৌতমবুদ্ধ, যীশুখ্রিষ্ট প্রমুখ মহামানব মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন মূল্যবোধ, নতুন আদর্শ, যা সে সময়ে সমাজে নানামুখী পরিবর্তন সূচনা করেছিল। বাংলাদেশের শহরগুলোর দিকে তাকালেও বোঝা যায় একাধিক সংস্কৃতির মিশ্ররূপ। প্রযুক্তি, মিডিয়া, নিউ মিডিয়ার প্রভাবে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও মিশ্রণ ঘটে।

Printed page 180

৪. সামাজিক উপাদান: এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন, পরিবার, পরিবার কাঠামো, শিক্ষা, নারী শিক্ষার বিস্তার, নারীর ক্ষমতায়ন, সমাজের মধ্যে নারী-পুরুষের আন্তঃসম্পর্ক ইত্যাদি। এগুলোর পরিবর্তন হলে সার্বিকভাবে সমাজ বদলে যায়।

৫. অর্থনৈতিক উপাদান: শিল্পায়ন, নগরায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন, বন্দর ইত্যাদির উন্নয়নের ফলে সমাজের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটে। যা মানুষের সম্পর্ক, মূল্যবোধ, আচরণ ইত্যাদিকে বদলে দেয়। শেষ পর্যন্ত সমাজের সকল ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধিত হয়।

৬. শিক্ষা : সামাজিক পরিবর্তনের একটি বিশেষ উপাদান হলো শিক্ষা। শিক্ষা হলো একধরনের সংস্কার সাধন ও বিরামহীন প্রক্রিয়া। সমাজের সদস্যদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার আগের অবস্থা থেকে অন্য ব্যবস্থায় নিয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে বাংলাদেশের সমাজে নারী শিক্ষার প্রসার জনগণের মধ্যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করেছে যা তাদের বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করেছে। এর ফলে দেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সৃষ্টি হয়েছে বহু সামাজিক নীতি ও আইন। যৌতুক আইন, পারিবারিক আইন, নারী উন্নয়ন নীতি প্রভৃতি শিক্ষার ফসল। নারী শিক্ষা নারীকে কর্মমুখী করেছে। এতে নারীর ক্ষমতায়নের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা, বাণিজ্য শিক্ষা প্রভৃতি সমাজে পরিবর্তন এনেছে।

৭. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি : প্রযুক্তি হলো বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিক। প্রযুক্তির প্রচলন ও প্রসারের মাধ্যমে সমাজ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিবর্গের মানসিক গঠন এবং সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন সাধিত হয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে বেতারের আবিষ্কার সামাজিক জীবনে আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনীতি এবং অন্যান্য আরও বহু ধরনের সামাজিক কাজকে প্রভাবিত করেছে। মোটর গাড়ি আজ সামাজিক সম্পর্কের পরিধিকে বিস্তৃত করেছে। প্রযুক্তির ক্রমোন্নতিতে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় দু'ধরনের ফলাফল দেখতে পাই। একটি প্রত্যক্ষ এবং অপরটি পরোক্ষ। কতকগুলো সামাজিক পরিবর্তন প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের অবশ্যম্ভাবী পরিণাম, যেমন– শ্রমিকের নতুন নতুন সংগঠন, সামাজিক যোগাযোগ পরিধির বিস্তৃতি, বিশেষ কাজে বিশেষ দক্ষতা অর্জন, গ্রামীণ জীবনের ওপর নাগরিক জীবনের প্রভাব প্রভৃতি। এগুলো প্রযুক্তির প্রত্যক্ষ প্রভাব। আর বেকারত্ব বৃদ্ধি, শ্রমিক-মালিকের মধ্যে ব্যবধান, প্রতিযোগিতার তীব্রতা বৃদ্ধি প্রভৃতি প্রযুক্তি পরিবর্তনের পরোক্ষ প্রভাব। কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তিবিদ্যার কল্যাণে উন্নত জাতের বীজ, সেচ, সার প্রয়োগের ফলে কৃষি উৎপাদন বহুগুণে বেড়ে গেছে। তাছাড়া আমাদের দেশে এখন মৎস্য চাষে নতুন নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। চিংড়ি চাষে অভাবনীয় পরিবর্তন, সমন্বিত মাছ চাষ, গবাদিপশুর প্রজনন, গরু মোটাতাজাকরণ প্রভৃতি প্রযুক্তির প্রত্যক্ষ ফসল। প্রযুক্তি কৃষি খামার অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

কাজ

একক : সাংস্কৃতিক উপাদানের প্রভাবে সৃষ্ট পরিবর্তনগুলোর একটি ছক তৈরি কর।

দলগত : সামাজিক পরিবর্তনে কৃষি প্রযুক্তির ভূমিকা চিহ্নিত কর।

৮. যোগাযোগ : যে দেশের যোগাযোগ মাধ্যম যত উন্নত সে দেশের অর্থনীতিও তত উন্নত। যোগাযোগ সামাজিক পরিবর্তনের একটি অন্যতম উপাদান। জল, স্থল ও আকাশপথে যোগাযোগ, টেলিফোন, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট, ই-মেইল, ডিশ অ্যান্টেনা, মোবাইল ফোন, রেডিও, টেলিভিশন, বিভিন্ন ধরনের পত্রপত্রিকা প্রভৃতি সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। আজকাল ঘরে বসে বিশ্বের সকল দেশের সাথে যোগাযোগ করা যায়। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পাঠাগার ঘরে বসে ব্যবহার করা যায়। প্রয়োজনীয় গ্রন্থ নির্বাচন করে পড়াশুনা করা যায়। যোগাযোগের এ অভাবনীয় পরিবর্তনের ফলে ঘরে বসে শিক্ষার্থীরা বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করছে। পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাচ্ছে।

সম্প্রতি মোবাইল প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের ব্যবহার সমাজ ও দেশকে উন্নয়নের পথে অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে গেছে। দূর প্রবাসে থাকা সন্তান, পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন এক মুহূর্তেই একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে।

Printed page 181

৯. শিল্পায়ন ও নগরায়ণ : শিল্পায়ন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা শিল্পভিত্তিক ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও সমাজে রূপান্তরিত হয়। শিল্পায়নের ফলে নগরায়ণ ঘটে। ব্যাপক শিল্পায়নের ফলে গ্রামীণজীবন ছেড়ে নগরজীবন পদ্ধতি গ্রহণের প্রক্রিয়াই নগরায়ণ। বাংলাদেশে স্বাধীনতাউত্তরকাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পের প্রসার ঘটেছে। এর মধ্যে পোশাক, ঔষধ, চা, চিনি, সুতা, কাগজ, তামাক, বিস্কুট, প্রসাধনী ও সাবান শিল্প প্রধান। শিল্প প্রসারের ফলে বেকারত্ব ঘুচাতে গ্রামের অনেক দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক নগরমুখী হচ্ছে এবং নগরজীবন গ্রহণ করছে। বর্তমানে শুধু পোশাকশিল্পেই ৪০ লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করছে। মজুরি কমিশন গঠন করে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করায় ১৯৯০ সালের পূর্ববর্তী শ্রমিকের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এই পরিবর্তন মজুরি কমিশনের নিয়মিত কাজ।

শিল্পায়নের ফলে আমাদের সমাজ জীবনে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়েছে। এদেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অধিকহারে উৎপাদন বৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় ও জাতীয় আয় বৃদ্ধির মূলে রয়েছে শিল্পায়ন। শিল্পায়নের ফলে শিল্পের স্থানীয়করণ প্রক্রিয়া সূচিত হয়ে নগরায়ণের সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে খুলনার খালিশপুর, চট্টগ্রামের বাড়বকুণ্ড, সিলেটের ছাতক প্রভৃতি আজ শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত।

শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে। এতে ভৌগোলিক দূরত্ব কমে গেলেও সামাজিক এবং আর্থিক দূরত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে। পুরুষ, নারী এক সাথে কাজ করছে। শিল্প শ্রমিকেরা অধিকাংশ সময় কাটায় সহকর্মীদের সাথে। কর্মক্ষেত্রে প্রাত্যহিক জীবনের প্রভাব ব্যক্তির সমগ্র জীবনধারাকে প্রভাবিত করে। ব্যক্তির জীবনদর্শন, আচার-আচরণ, মানসিকতা, মূল্যবোধ প্রভৃতির পরিবর্তন ঘটেছে। শিল্পনগরীর বাসস্থান স্বল্পতা, স্বল্প মজুরি ইত্যাদি কারণে পরিবারের সব সদস্যদের নিয়ে একসাথে বসবাস করা সম্ভব হয় না। ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের সৃষ্টি হয়েছে। আবার পারিবারিক সংগঠনে বিবাহবিচ্ছেদ, শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠু সামাজিকীকরণে সমস্যা, প্রবীণদের নিরাপত্তাহীনতা, অপরাধ প্রবণতাসহ বিভিন্ন সমস্যার জন্ম দিয়েছে। আমাদের দেশের শহরে বস্তির উদ্ভব এ শিল্পায়নের ফসল। যেসব স্থানে পোশাকশিল্প, চামড়াশিল্প, চুড়িশিল্প, তামাক-বিড়িশিল্প গড়ে উঠেছে সেসব স্থানে বস্তির উদ্ভব হয়েছে। অপ্রতুল নাগরিক সুবিধা, বৈষম্য বস্তিগুলো সামাজিক জীবনে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের, পরিবেশ সৃষ্টি করে। অপরাধ, কিশোর অপরাধের মতো বহু সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি করে। এসব সমস্যা আবার অন্যান্য সমস্যার সৃষ্টি করেছে, কঠিন করেছে নগরজীবনকে। শিল্পায়ন শহর অর্থনীতিতে একদিকে যেমন আশীর্বাদ অন্যদিকে অভিশাপও। তবে সমন্বিত প্রচেষ্টায় অভিশাপ দূর করা সম্ভব।

Loading the rest of the chapter…

Textbook content © National Curriculum and Textbook Board (NCTB), Bangladesh. Shown for study.

Trusted resources

Official links checked by the Zntext team. Part of the context pack.