এ পৃথিবীর বয়স প্রায় 4.54 বিলিয়ন বছর। আজকে পৃথিবীকে যেমন দেখছ, অনেক অনেক বছর আগে পৃথিবীর রূপ কিন্তু এমন ছিল না। আজ থেকে 500 বা 600 মিলিয়ন বছর আগে এই পৃথিবী ছিল ঘন বনজঙ্গল, নিচু জলাভূমি আর সাগর-মহাসাগরে পরিপূর্ণ। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত মৃত প্রাণী, উদ্ভিদ, শৈবাল-ছত্রাক নিচু এলাকাগুলোতে জমা হয়েছিল। তার উপর পড়তে থাকল পলির আস্তরণ। এভাবে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে এ সকল উদ্ভিদ আর প্রাণীর দেহাবশেষের উপর হাজার হাজার ফুট মাটি, বিভিন্ন শিলার আস্তরণ হয়ে গেল। উচ্চচাপ, উচ্চ তাপমাত্রা, মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে বিভিন্ন ভৌত আর রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে কয়লা, পেট্রোলিয়াম আর প্রকৃতিক গ্যাস সৃষ্টি হলো। এদেরকে বলে জীবাশ্ম জ্বালানি। কয়লার মূল উপাদান কার্বন। আর পেট্রোলিয়ামের মূল উপাদান শুধু কার্বন ও হাইড্রোজেনের দ্বারা সৃষ্ট যৌগ হাইড্রোকার্বন। হাইড্রোকার্বন হলো জৈব যৌগ। অ্যালকোহল, অ্যালডিহাইড, কিটোন, কার্বক্সিলিক এসিডসহ আরও যে সকল জৈব যৌগ আছে তারা মূলত হাইড্রোকার্বন থেকেই সৃষ্ট। এগুলো নিয়েই এ অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।
Printed page 262
এ অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা
জীবাশ্ম জ্বালানির ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব।
পেট্রোলিয়ামকে জৈব যৌগের মিশ্রণ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারব।
পেট্রোলিয়ামের ব্যবহার ব্যাখ্যা করতে পারব।
হাইড্রোকার্বনের ধরন ও শ্রেণিবিভাগ ব্যাখ্যা করতে পারব।
সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনের প্রস্তুতির বিক্রিয়া ও ধর্ম ব্যাখ্যা এবং এদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারব।
প্লাস্টিক দ্রব্য ও তন্তু তৈরির রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং এর ব্যবহার বর্ণনা করতে পারব।
পরিবেশের ওপর প্লাস্টিক দ্রব্য অপব্যবহারের কুফল উল্লেখ করতে পারব।
প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোলিয়াম এবং কয়লা ব্যবহারের সুবিধা, অসুবিধা ও ব্যবহারের কৌশল ব্যাখ্যা করতে পারব।
হাইড্রোকার্বন থেকে অ্যালকোহল অ্যালডিহাইড ও জৈব এসিডের প্রস্তুতির কৌশল ব্যাখ্যা করতে পারব।
অ্যালকোহল, অ্যালডিহাইড ও জৈব এসিডের ব্যবহার করতে পারব।
পরিবেশের উপর প্লাস্টিক দ্রব্যের প্রভাব সম্পর্কিত অনুসন্ধানমূলক কাজ করতে পারব।
পরীক্ষার মাধ্যমে জৈব ও অজৈব যৌগের মধ্যে পার্থক্য করে দেখাতে পারব।
জীবাশ্ম জ্বালানির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা প্রদর্শন করতে পারব।
Printed page 263
১১.১ জীবাশ্ম জ্বালানি (Fossil Fuel)
বহু প্রাচীনকালের উদ্ভিদ এবং প্রাণীর মৃতদেহের যে ধ্বংসাবশেষ মাটির নিচে পাওয়া যায় তাকে জীবাশ্ম বলে। কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম যেগুলো আমরা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি সেগুলো মাটির নিচের জীবাশ্ম শত শত মিলিয়ন বছর ধরে পরিবর্তিত হয়ে তৈরি হয়েছে। তাই কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়ামকে জীবাশ্ম জ্বালানি বলে।
শত শত মিলিয়ন বছর আগে এ পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন সময় ছিল যখন এ পৃথিবীজুড়ে ছিল ঘন বনজঙ্গল, নিচু জলাভূমি আর সমুদ্র সেখানে ছিল জলজ উদ্ভিদ, ফাইটোপ্লাংকটন (পানিতে বসবাসকারী এক ধরনের শৈবাল), জুওপ্লাংকটন (পানিতে বসবাসকারী এক ধরনের ছোট প্রাণী)। বিভিন্ন সময় বড় বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এই ধরনের উদ্ভিদ, প্রাণী মাটিচাপা পড়ে যায়। সময়ের বিবর্তনে তার উপর আরও মাটি পড়ে। ধীরে ধীরে এগুলো মাটির গভীর থেকে গভীরে চলে যেতে থাকে। ফলে এর উপর চাপ ও তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। বায়ুর অনুপস্থিতিতে এগুলোর ক্ষয় ও রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। শত শত মিলিয়ন বছর ধরে তাপ, চাপ আর রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে বড় বড় উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রতম উদ্ভিদ ও প্রাণী পর্যন্ত সকল ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির সৃষ্টি হয়েছে। বড় বড় উদ্ভিদ থেকে কয়লা আর ফাইটোপ্লাংকটন, জুওপ্লাংকটন ও মৃত প্রাণীর দেহাবশেষ থেকে পেট্রোলিয়ামের সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিবর্তন অব্যাহত থাকায় পেট্রোলিয়াম আরও পরিবর্তিত হয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস সৃষ্টি হয়। তাই কোথাও কোথাও পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস এক সাথেই থাকে। যেমন– বাংলাদেশের হরিপুর গ্যাসক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাসের সাথে পেট্রোলিয়ামও পাওয়া গেছে। এই জীবাশ্ম জ্বালানির মূল উৎস জীবদেহ, তাই এ সকল জ্বালানির মূল উপাদান কার্বন ও কার্বনের যৌগ।
১১.১.১ প্রাকৃতিক গ্যাস (Natural Gas)
সাধারণত প্রাকৃতিক গ্যাসের বিভিন্ন উপাদানের অনুপাত তার প্রাকৃতিক উৎসের ভিত্তিতে ভিন্ন হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান হলো মিথেন। এছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাসে ইথেন, প্রোপেন, বিউটেন ও আইসোবিউটেন এবং পেন্টেন থাকে। বাংলাদেশে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক গ্যাসে ৯৩-৯৮% মিথেন, ০.২-৩.৯% ইথেন, ০.০৫-১.২% প্রোপেন, ০.১-০.৭২% বিউটেন এবং ১.২% পেন্টেন পাওয়া গেছে।
১১.১.২ পেট্রোলিয়ামের উপাদানসমূহ ও তাদের পৃথকীকরণ
পেট্রোলিয়াম সাধারণত 5000 ফুট বা তার চেয়েও গভীরে শিলা স্তরের মধ্যে পাওয়া যায়। পেট্রোলিয়ামের সাথে অনেক সময় প্রাকৃতিক গ্যাস থাকে, যা পেট্রোলিয়ামের উপরিভাগে চাপ প্রয়োগ
Printed page 264
করে। কূপ খনন করা হলে এই প্রাকৃতিক গ্যাস পেট্রোলিয়ামকে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে উঠে আসতে সাহায্য করে। যে পেট্রোলিয়াম খনি থেকে সরাসরি পাওয়া যায় তাকে অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) বা পেট্রোলিয়াম বলে। এই অপরিশোধিত তেল অস্বচ্ছ, এতে কখনো কখনো সালফারের কিছু কিছু যৌগ থাকার কারণে দুর্গন্ধযুক্ত হয়। এই পেট্রোলিয়াম মূলত বিভিন্ন হাইড্রোকার্বনের মিশ্রণ এবং সরাসরি ব্যবহার উপযোগী নয়। এই অপরিশোধিত তেল আংশিক পাতন পদ্ধতিতে স্ফুটনাঙ্কের উপর ভিত্তি করে পৃথক করা হয়।
আংশিক পাতনও হলো এক ধরনের পাতন। এখানে বাষ্পকে ঠান্ডা করার জন্য লম্বা কলাম থাকে। কলাম আবার বিভিন্ন অংশে বিভক্ত। নিচের অংশটির তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি। যে অংশ যত উপরে তার তাপমাত্রা তত কম। ফলে যদি একাধিক তরলের মিশ্রণকে তাপ দিয়ে বাষ্পীভূত করে আংশিক পাতন কলামের নিচের অংশে প্রবেশ করানো হয় তবে বাষ্পের ধর্ম অনুযায়ী তা কলামের উপরের দিকে উঠবে। যেহেতু উপরের অংশগুলোর তাপমাত্রা কম থাকে, তাই তরলের মিশ্রণের প্রত্যেকটি উপাদান তাদের স্ফুটনাঙ্ক অনুযায়ী আংশিক পাতন কলামের বিভিন্ন অংশে পৃথক হয়।
Figure: চিত্র ১১.০১: পেট্রোলিয়ামের আংশিক পাতন
লেবেল: 20°C, 70°C, 120°C, 170°C, 270°C, 340°C, 340°C, পেট্রোলিয়াম গ্যাস, গ্যাসোলিন (পেট্রোল), ন্যাপথা, কেরোসিন, ডিজেল তেল, লুব্রিকেটিং তেল, প্যারাফিন মোম, জ্বালানি তেল, বিটুমিন (পিচ), অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, চুল্লি (furnace)
বর্ণনা: একটি উল্লম্ব আংশিক পাতন কলাম দেখানো হয়েছে। কলামের নিচের দিকে একটি চুল্লি (furnace) থেকে একটি নল দিয়ে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম কলামের নিচের অংশে প্রবেশ করানো হয়েছে। কলামের উপরের দিক থেকে নিচের দিকে ক্রমানুসারে বিভিন্ন স্তরে পাশ থেকে নির্গমন নল বের হয়ে আছে, প্রতিটি নলের পাশে তাপমাত্রা ও উৎপন্ন পদার্থের নাম লেখা। সবচেয়ে উপরের নল থেকে পেট্রোলিয়াম গ্যাস, এবং সবচেয়ে নিচ থেকে বিটুমিন (পিচ) বের হচ্ছে।
আংশিক পাতন কলাম থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন অংশের নাম, বিভিন্ন
Printed page 265
অংশের ফুটনাঙ্ক, বিভিন্ন অংশে যে হাইড্রোকার্বনসমূহ থাকে তাদের কার্বন সংখ্যা এবং তাদের ব্যবহার নিচে বর্ণনা করা হলো:
(i) পেট্রোলিয়াম গ্যাস: এ অংশের ফুটনাঙ্ক 0∘C থেকে 20∘C পর্যন্ত। এ অংশে যে হাইড্রোকার্বনসমূহ থাকে তাদের অণুতে কার্বন সংখ্যা 1 থেকে 4 পর্যন্ত। পেট্রোলিয়ামে শতকরা দুই ভাগ পেট্রোলিয়াম গ্যাস থাকে। এ গ্যাসকে চাপ প্রয়োগ করে তরলে পরিণত করে সিলিন্ডারে ভর্তি করা হয় এবং LPG (Liquefied Petroleum Gas) নামে রান্নার কাজে ও অন্যান্য কাজে তাপ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয়।
(ii) পেট্রোল (গ্যাসোলিন): এ অংশের ফুটনাঙ্ক 21∘C থেকে 70∘C পর্যন্ত। এ অংশে যে হাইড্রোকার্বনসমূহ থাকে তাদের অণুতে কার্বন সংখ্যা 5 থেকে 10 পর্যন্ত। পেট্রোলিয়ামে শতকরা 5 ভাগ পেট্রোল থাকে। একে গ্যাসোলিনও বলা হয়। যানবাহনের ইঞ্জিনে জ্বালানি হিসেবে গ্যাসোলিন ব্যবহার করা হয়।
(iii) ন্যাপথা: এ অংশের ফুটনাঙ্ক 71∘C থেকে 120∘C পর্যন্ত। এ অংশে যে হাইড্রোকার্বনসমূহ থাকে তাদের অণুতে কার্বন সংখ্যা 7 থেকে 14 পর্যন্ত। পেট্রোলিয়ামে শতকরা 10 ভাগ ন্যাপথা থাকে। জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও অন্যান্য অনেক ব্যবহার্য দ্রব্য তৈরি করা হয়।
(iv) কেরোসিন: এ অংশের ফুটনাঙ্ক 121∘C থেকে 170∘C পর্যন্ত। এ অংশে যে সকল হাইড্রোকার্বন থাকে তাদের অণুতে কার্বন সংখ্যা 11 থেকে 16 পর্যন্ত। পেট্রোলিয়ামে শতকরা 13 ভাগ কেরোসিন থাকে। পেট্রোলিয়ামের এই অংশকে জেট ইঞ্জিনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
(v) ডিজেল: এ অংশের ফুটনাঙ্ক 171∘C থেকে 270∘C পর্যন্ত। এ অংশে যে হাইড্রোকার্বনসমূহ থাকে তাদের অণুতে কার্বন সংখ্যা 17 থেকে 20 পর্যন্ত। যানবাহনের জ্বালানি, পিচ্ছিলকারক পদার্থ ও দ্রাবক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
(vi) প্যারাফিন মোম: এ অংশের ফুটনাঙ্ক 271∘C থেকে 340∘C পর্যন্ত। এ অংশে যে হাইড্রোকার্বনসমূহ থাকে তাদের অণুতে কার্বন সংখ্যা 20 থেকে 30 পর্যন্ত। প্যারাফিন মোম টয়লেট্রিজ এবং ভ্যাসলিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
(vii) পিচ: এ অংশের ফুটনাঙ্ক 340∘C থেকে উচ্চ তাপমাত্রা পর্যন্ত। এ অংশে যে হাইড্রোকার্বনসমূহ থাকে তাদের অণুতে কার্বন সংখ্যা 30 এর বেশি। রাস্তা তৈরিতে এটি কাজ লাগে।